২৬তম দলিল: অক্টোবর ২০২৪
কল্পনা, বাস্তব, আর রূপকের মাঝে
বাংলার উৎসবের মাস এবছর দ্রোহের মাস হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলো। দুর্গাপুজোর সময়ে অভূতপূর্ব ভাবে অনশনরত জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ালেন। সরকার ও শাসক দল নানাভাবে আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করলেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সত্যিই মনে আশা জোগায়। নিঃসন্দেহে একরকমের হতাশা অনেককে গ্রাস করেছে। অনেকেই ভাবছেন কিছু হবেনা, এতকিছু করে কি লাভ হলো, ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে লড়াই খুব দীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক। জুনিয়র ডাক্তাররা যে সাহস ও উৎকর্ষের পরিচয় দিলেন, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ আমার আপনার সবার। উৎসবের শুভেচ্ছা জানাই, তার সঙ্গে জানাই লড়াইয়ের আহ্বান, প্রতর্কর তরফ থেকে।
চিন্তা ভাবনা
দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি ভারতের ইতিহাসচর্চায় মার্ক্সবাদী বিশ্ববীক্ষা ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগের পুরোধাপুরুষ হিসাবে সুপরিচিত। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণিতের অধ্যাপনা করলেও কোসাম্বি কখনোই বিদ্যায়তনিক শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হয়ে থাকেননি। নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন পরিসংখ্যানশাস্ত্র, মুদ্রাবিদ্যা, ইতিহাস, সাহিত্য, ও ভাষাচর্চায়।
বামমনোভাবাপন্ন হলেও দলীয় রাজনীতিতে তিনি কোনোদিন যুক্ত হননি। তাঁর আপোষহীন স্পষ্টবক্তা স্বভাবের কারণেই। আজীবন জ্ঞানচর্চায় ডুবে থাকা কোসাম্বিকে কেবলই একজন ‘হ্র্যনেসঁস ম্যান’ মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তথাপি গবেষকদের চোখের আড়ালে রয়ে যাওয়া কোসাম্বির আরো এক সত্ত্বার দিকে আলোকপাত না করলে তাঁর রাজনৈতিক অবদান ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের সামগ্রিক মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে যে দুনিয়াব্যাপী শান্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে ভারতের হয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ডি ডি কোসাম্বি। মালয়, প্যালেস্টাইন, ও কেনিয়ায় অস্তগামী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মরণকামড়, আলজিরিয়ায় ফরাসি অত্যাচার, এবং কোরিয়া ও ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের ফলে পঞ্চাশের দশকের (১৯৪৯-১৯৬২) ঠাণ্ডাযুদ্ধ ভূরাজনৈতিক তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে। সেই সময়ে বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের নানা সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধি হিসাবে এই ‘ম্যাভেরিক’ মগজ-খাটিয়ে একের পর এক অকুতোভয় যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য রাখেন।
১৯৪৯ সালে নিউ ইয়র্কের ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে আয়োজিত শান্তি সম্মেলনে কোসাম্বি একজন ‘এশিয়ান’ হিসাবে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, এশিয়া শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড নয়, নবীন গণতান্ত্রিক দেশসমূহের এক জীবন্ত ধারণা। এশিয়ার ক্ষুধাসমস্যার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংসাত্মক কৃষিজ পণ্য রপ্তানিনীতিকে দায়ী করে তিনি বলেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বে ক্ষুধা যুদ্ধাস্ত্রতুল্য এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার মারণ অভিঘাত লাগাতার পারমানবিক বোমাবর্ষণের চেয়ে কিছু কম নয়।
দেশে ফিরে তিনি ‘সাম্রাজ্যবাদ ও শান্তি’ শিরোনামে একটি লেখা লেখেন যা ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মান্থলি রিভিউতে প্রকাশ পায়। সাম্রাজ্যবাদকে সমস্ত আগ্রাসী ও বর্ণবিদ্বেষী যুদ্ধের মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, যুদ্ধ ও শান্তির ক্ষেত্রে কোনো ব্যাক্তিবিশেষের নির্ণায়ক ভূমিকা থাকে না। বরং রাষ্ট্রক্ষমতা যে শ্রেণীর হাতে সেই পুঁজিপতিদের বিশ্ববাজার দখল ও মুনাফা লুঠ করার প্রবৃত্তিই এখানে চূড়ান্ত নির্ধারক। শান্তি আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অক্ষের উপর: উপনিবেশ ও নব্য উপনিবেশগুলির আর্থ-রাজনৈতিক মুক্তি ও বিশ্বব্যাপী শ্রেণী সংগ্রাম।
অল্প সময়ের মধ্যেই অল ইণ্ডিয়া পিস কনভেনশন ও ওয়ার্ল্ড পিস কাউন্সিলের কার্যকরী সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশে ও বিদেশে কোসাম্বি শান্তি আন্দোলনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বম্বেতে যেমন তিনি মিলশ্রমিক ও বীমাকর্মীদের সভায় ভাষণ দিয়েছেন, তেমনই ১৯৫২ সালে পিকিং থেকে এশীয় শান্তি সম্মেলনের পরিকল্পনা সভায় রিপোর্ট পেশ করেছেন। বিপ্লবোত্তর মহাচীনের পথে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ভারতের ভবিষ্যৎ।
তাঁর কাছে শান্তির জন্য যুদ্ধের অনুপস্থিতি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত ছিল। কিন্তু, তা কোনোমতেই যথেষ্ট ছিল না। ১৯৫৫ সালে হেলসিঙ্কিতে আয়োজিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসাবে দৃপ্ত কন্ঠে কোসাম্বি ঘোষণা করেন, সমস্ত দেশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতালাভ ব্যতীত শান্তির স্বপ্ন অলীক। ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘাঁটিসমূহ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার নামে নব্য-সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক হঠকারিতার নগ্ন আস্ফালন রোধ না করা গেলে বিশ্বশান্তির পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে তিনি বুঝেছিলেন পারমাণবিক শক্তির সামরিক পরীক্ষা-প্রয়োগ শান্তির পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। জীবনের শেষ দশকে সৌরশক্তির পক্ষে জোর সওয়াল করে বেশ কয়েকটি লেখাও লিখেছিলেন।
দুর্ভাগ্যবশত, রাজনৈতিক কার্যকলাপের খেসারৎ তাঁকে দিতে হয়েছিল। অন্যান্য কারণের মধ্যে পারমাণবিক শক্তির সামরিকীরণের সুতীব্র সমালোচনা করার ফলে হোমি ভাবার টাটা ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনার চাকরি হারান। এর আগেই অবশ্য শান্তি আন্দোলনের মূল স্রোতের সাথে তাঁর যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। সোভিয়েত রাশিয়া ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক ও আদর্শগত সংঘাতের ফলে তাঁর মন দ্বন্দ্বে ভারাক্রান্ত হয়। তার উপর ভারতের শান্তি আন্দোলনকর্মীদের ক্ষুদ্রস্বার্থ নিয়ে পারস্পরিক সংঘাত ও সুবিধাবাদী মানসিকতা তাঁকে বিব্রত ও ব্যাথিত করেছিল। ১৯৬৩ সালের মধ্যে কোসাম্বি শান্তি আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে আসেন। তথাপি তিনি বিশ্বশান্তির স্বপ্নকে জীবনের শেষদিন অবধি লালন করেছিলেন। ১৯৬৬তে মৃত্যুর কয়েকমাস আগে জাপানের বন্ধু অধ্যাপক য়ামাজাকিকে লেখেনঃ
হিরোশিমার [যুদ্ধোত্তর] সুন্দর ছবিগুলো আজ হাতে পেলাম। সারা বিশ্বকে এ কথা ভুলতে দেওয়া যাবে না, এ ঘটনাও মানবেতিহাসে আর কোথাও ঘটতে দেওয়া যাবে না।
বলাই বাহুল্য আজকের যুদ্ধে উন্মত্ত পৃথিবীতে আমরা হিরোশিমার চেয়েও ভয়াবহ ধ্বংসলীলা ও গণহত্যা প্রতিনিয়ত শুধু চাক্ষুষ করছি না, তাতে নির্লজ্জ সমষ্টিগত নীরবতার মাধ্যমে ইন্ধনও যোগাচ্ছি। কোসাম্বিদের নেতৃত্বে পঞ্চাশের দশকের বিশ্ব শান্তি আন্দোলন যুদ্ধ থামাতে অসফল হলেও আমাদের আত্মতুষ্ট প্রজন্মের মতো নৈতিক অবস্খলনের দোষে কখনোই দুষ্ট হয়নি।
সুচিন্তন দাশ
দেখার মতো
আর জি করের নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর কর্মরত মহিলাদের সুরক্ষা নিয়ে নানাবিধ আলোচনা গণপরিসরে উঠে এসেছে। রাস্তা ঘাটে শুধু নয়, কর্মক্ষেত্রেও মহিলারা একইভাবে অসুরক্ষিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমস্যা নিরসনের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত থাকে না। থাকলেও তা কার্যকরী নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে থাকেন শ্রমজীবী গরীব মহিলারা। ভারতবর্ষ অসংগঠিত ক্ষেত্রে মহিলাদের শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর জি কর আন্দোলনে তাই এই শ্রেনীর প্রান্তিক মহিলাদের অংশগ্রহণ পূর্ণ মাত্রায় চোখে পড়েছে। এই আবহে জন নাট্য মঞ্চের ঐতিহাসিক প্রযোজনা ঔরত ফিরে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নাটক শ্রমজীবী মহিলাদের নিত্যদিনের সমস্যা ও সাহসিকতার গল্প অবলীলায় মানুষের মাঝে পৌঁছে দেয়।
পড়ার মতো
২০২০ গালওয়ান সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ভারত ও চীনের মাঝে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। ২০২৪ সালে আবার দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ সীমান্তে স্বাভাবিকতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নিঃসন্দেহে খুব ভালো খবর। ভুরাজনীতিতে এই মৈত্রীর প্রয়াস সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে অনেকে মনে করছেন। ভারতবর্ষে বিদেশী বিনিয়োগ অত্যধিক কমে যাওয়ায় ভারতের বুর্জোয়ারা বেশ চিন্তায় পড়ে গেছেন। তাঁরা বুঝছেন, চীনের বিনিয়োগ ছাড়া রফতানি সমস্যার সমাধান হবেনা। তাছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নাগপাশের আগল ছাড়িয়ে বহু দেশ মাল্টি পোলারিটির দিকে ঝুঁকছে। চীনের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক মৈত্রীর বিশ্লেষণ পড়ুন মার্কসবাদী পথে, এই লিংকে।
আন্দোলনের আটকাহন
তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমবুদুরে বহুজাতিক সংস্থা স্যামসাংয়ের কারখানায় সি আই টি ইউএর নেতৃত্বে ১১০০ শ্রমিকের এক মাসের উপর ধর্মঘট সফল হলো। মজুরি বৃদ্ধি, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার সহ শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবী স্যামসাং মেনে নিতে বাধ্য হয়। আন্দোলনরত কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না, এও তারা জানিয়েছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণ পরবর্তী ভারতের ইতিহাসে এ জয় শ্রেণী সংগ্রামে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। আমরা তাঁদের আন্দোলনকে কুর্নিশ জানাই, ও আগামী দিনে দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রে শ্রেণী সংগ্রাম তীব্রতর করার লক্ষ্যে ব্রতী হওয়ার অঙ্গীকার করি। আন্দোলনের ব্যাপারে বিস্তারিত পড়ুন এখানে।
স্মরণীয়
পাবলো পিকাসো (১৮৮১-১৯৭৩) বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। কিউবিজম সহ নানা শিল্প আন্দোলন তাঁর হ্যাঁ ধরে সমৃদ্ধি পায়। তিনি ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের কট্টর বিরোধিতা করে নানা সময়ে রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হন। তাঁর জন্ম হয় ১৮৮১ সালের ২৫শে অক্টোবর, স্পেনের মালাগায়। তাঁর রাজনৈতিক শিল্পের কথা পড়ুন এখানে।
আবার পরের মাসে, নতুন গল্প, নতুন অঙ্গীকার নিয়ে ফেরত আসব।





