৩৬তম দলিল: অগাষ্ট ২০২৫
কল্পনা, বাস্তব আর রূপকের মাঝে
কোনোদিনও ভাবিনি এক এক করে তিন বছর অতিক্রম করে ফেলবো আমরা। গত তিন বছরে অনেক কিছুই পাল্টেছে, পাল্টায়নি শুধু প্রতর্কর খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। এভাবেই আরো বেশ কিছুদিন প্রতর্ক আপনাদের কাছে বিকল্প ভাবনা নিয়ে আসবে, এই আশা আমরা রাখতে পারি। আপনাদের সহযোগিতার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
চিন্তা ভাবনা
আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় কারা হবেন? শুধুমাত্র কি কীর্তিমান ব্যক্তিরা না যে মানুষেরা নিজেদের জীবনকেই আমাদের আদর্শ পাঠ করে তুলেছেন?--- প্রশ্ন তুলেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এক মহান চিন্তাবিদের বীক্ষণে তুলেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এক মহান চিন্তাবিদের বীক্ষণে তাঁর পূর্বজ কালোত্তীর্ণ এক মহামানব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ফিরে দেখার অতিক্ষুদ্র প্রয়াস এই নিবন্ধ।
কারা স্মরণীয় হবেন? কবি বলছেন ভক্তি যাঁদের আমাদের হৃদয়ে সজীব করে রাখে তাঁরাই স্মরণীয়। যাঁদের নাম স্মরণ আমাদের সারাদিনের নানা মঙ্গলপ্রচেষ্টার উপক্রমণিকা হতে পারে, তাঁদেরই স্মরণ করব। যে মহাত্মা সমস্ত জীবনের দ্বারা কোন কাজ করেছেন তাঁর জীবনই আলোচ্য হওয়া উচিত।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'চারিত্রপূজা'য় ( ১৯০৭) লিখছেন, "বিদ্যাসাগরের চরিত্রে যাহা সর্বপ্রধান গুণ, যে গুণে তিনি পল্লি -আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালি জীবনের জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া --হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে--করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন..."
বাংলা ভাষার বিবর্তনে ঈশ্বরচন্দ্রের অগ্রণী ভূমিকা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলছেন যে বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তাঁর আগে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু তিনিই বাংলা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। তিনি গদ্যভাষাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুসংযত করে তাকে সহজ গতি দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন আলোকপ্রাপ্ত বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির জন্য ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় থাকা আবশ্যিক। এছাড়া বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে সংস্কৃত সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করানোই নয়, সংস্কৃত কাব্যের সীমিত যতিচিহ্ন বিদ্যাসাগরের কলমে ছন্দোময় বাংলা গদ্যে রূপায়িত হল।
বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্ত পর্যালোচনা করে রবীন্দ্রনাথ এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে অতি দরিদ্র পিতা-পিতামহ-মাতার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তেজস্বিতা, কষ্টসহিষ্ণুতা, নিরহংকার, বল, সাহস , কৌতুকপ্রিয়তা ও সর্বোপরি অসীম দয়াবান হৃদয় অর্জন করেছিলেন। তাঁর ক্ষুরধার মেধা জয় করেছিল সীমাহীন দারিদ্র্যকে। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে একদিকে তিনি যেমন ভারতীয় অন্যদিকে ইউরোপীয় মহাপুরুষদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও তাঁর মধ্যে বিরাজমান। বেশভূষায়, আচার ব্যবহারে, শাস্ত্রজ্ঞানে তিনি সম্পূর্ণ বাঙালি আবার নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যবাদিতা, লোকহিতৈষা, আত্মনির্ভরতায় তিনি ইউরোপীয় মহাজনদের সাথে তুলনীয়।
স্ত্রীজাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের বিশেষ স্নেহ অথচ ভক্তি ছিল। রবীন্দ্রনাথের মতে সেটিও তাঁর সুমহান পৌরুষের প্রধান লক্ষণ। আঠেরো শতকের শেষ ও উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এদেশে নারীশিক্ষার কোনরকম সুব্যবস্থা ছিল না। তাই সরকারী উদ্যোগে মেয়েদের স্কুল তৈরীতে বেথুন সাহেবের সক্রিয় সহযোগী হলেন ঈশ্বরচন্দ্র। কলকাতায় স্থাপিত হল মেয়েদের জন্য প্রথম সরকারী স্কুল। বিরোধী জনমত উপেক্ষা করেই ছাত্রী সংগ্রহ হতে থাকল। এছাড়া নিজের উদ্যোগে তিনি জেলায় জেলায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন।
প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সেরেস্তাদার, হেড পন্ডিত, রাইটার, ক্যাশিয়ার ইত্যাদি নানা দায়িত্ব সামলে পরবর্তীতে সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা ও শেষে ঐ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন আবর্তিত হয়েছিল। সংস্কৃত কলেজের পঠনপাঠন ও ব্যবস্থাপনায় তিনি আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল ছাত্রদের সংস্কৃতর সঙ্গে সমানভাবে ইংরেজি শিখতে হবে, কিন্তু লক্ষ্য হবে সংস্কৃত নয়, ইংরেজিও নয়, বাংলা ভাষায় বিদ্যাচর্চা। শিক্ষক বিদ্যাসাগরের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল অব্রাহ্মণ ছাত্রদের জন্য সংস্কৃত কলেজের দরজা খুলে দেওয়া- রবীন্দ্রনাথের মতে সেটিও ছিল সামাজিক যুদ্ধে জয়লাভের সমতুল।
তবে আট বছর দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে মনান্তরের কারণে তিনি কর্মত্যাগ করেন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, " বিধাতা তাঁহাকে একাধিপত্য করিবার জন্য পাঠাইয়া ছিলেন, অধীনে কাজ চালাইবার গুণগুলি তাঁহাকে দেন নাই।"
" শাস্ত্রে কি বালবিধবাদের জন্য কোন উপায়েরই উল্লেখ নেই?"--মা ভগবতীদেবীর এই সময়োচিত প্রশ্নের সম্মুখীন হন শাস্ত্রজ্ঞ ঈশ্বরচন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের মতে মাতার পুত্র উপায় অন্বেষণে প্রবৃত্ত হয়ে এক প্রচন্ড সমাজসংগ্রামে লিপ্ত হলেন। শুরু করলেন শাস্ত্রসমুদ্র মন্থন। খুঁজে পেলেন পরাশরসংহিতায় বিধবা বিবাহের পক্ষে শাস্ত্রীয় প্রমাণ। রবীন্দ্রনাথ চারিত্রপূজায় লিখছেন,"তখন দেশের মধ্যে সংস্কৃত শ্লোক ও বাংলা গালি-মিশ্রিত এক তুমুল কলকোলাহল উত্থিত হইল। সেই মুষলধারে শাস্ত্র ও গালিবর্ষণের মধ্যে এই ব্রাহ্মণবীর বিজয়ী হইয়া বিধবা-বিবাহ শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ করিলেন এবং তাহা রাজবিধিসম্মত করিয়া লইলেন।"
সংস্কৃত কলেজের কাজ ছেড়ে দেবার পর বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি মেট্রোপলিটন ইনস্টিট্যুশন। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেন যে বাঙালির নিজের চেষ্টায় ও নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ স্থাপন এই প্রথম। ঐ কলেজকে তিনি যে একা সবরকম বাধাবিপত্তি থেকে রক্ষা করে তাকে সগৌরবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করে দিলেন- এর থেকে বিদ্যাসাগরের কেবল লোকহিতৈষা ও অধ্যবসায় নয়, তাঁর সজাগ ও সহজ কর্মবুদ্ধি প্রকাশ পায়।
" বিদ্যাসাগর বঙ্গদেশে তাঁহার অক্ষয় দয়ার জন্য বিখ্যাত।" ঈশ্বরচন্দ্রকে বিদ্যাসাগর উপাধি দিয়েছিল শিক্ষিত মানুষের সংস্থা। কিন্তু তাঁকে 'দয়ার সাগর' বলে ডেকেছিল নামগোত্রহীন সেইসব অগণিত মানুষ যারা দেখেছিল এই মানুষটি কিভাবে জাতপাত ও ধর্মের ওপর মনুষ্যত্বকে স্থান দিয়েছেন। পরোপকার ও দানের ক্ষেত্রে তাঁর কোন বাছবিচার ছিল না, না ছিল চেনা অচেনার ভেদ। কতশত ঋণগ্রস্তকে তিনি ঋণমুক্ত করেছিলেন,কত কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে দায়মুক্ত করেছেন, কত দুঃস্থ ছাত্রের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। এহেন মানুষটিও আত্মীয় বান্ধবদের কাছ থেকে সহৃদয় ব্যবহার পাননি। কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে কৃতঘ্নতা পেয়েছেন।
অগাধ পান্ডিত্য, বিপুল কর্মকাণ্ডময় জীবনচর্যা, আকাশচুম্বী চারিত্রিক দৃঢ়তা,ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের বিশিষ্টতা উপলব্ধি করে রবীন্দ্রনাথ চারিত্রপূজায় লিখলেন, "...দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব --এবং যতই তাহা অনুভব করিব ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল হইবে এবং বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে।"
আজ দুশো বছর পরেও এই মহামানবের কথা বারবার শোনা দরকার , বারবার বলা দরকার। বর্তমান সমাজ ও প্রজন্মের কাছে তাঁর দিকদর্শন একান্ত জরুরী।
সুলগ্না রায়
শোনার মতো
দ্বিতীয় কাজী নজরুল ইসলাম স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হলো জামুড়িয়াতে। বক্তব্য রাখলেন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক সুচেতনা চট্টোপাধ্যায়। ২০ শতকের গোড়ার দিক কলকাতা শহরের প্রগতিশীল মুসলমান সাহিত্য সমাজে কাজী নজরুল ইসলাম আর মুজফ্ফর আহমেদের আবির্ভাব মোটামুটি একই সময়ে ঘটেছিল। তাঁদের সখ্যতা ও বন্ধুত্ব সর্বজনবিদিত। রুশে বলসেভিক বিপ্লব পরবর্তী সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুচেতনা চট্টোপাধ্যায় কলকাতা শহরে বামপন্থী আন্দোলনের সূচনা দেখতে পান। বক্তৃতা শুনুন উপরে।
পড়ার মতো
বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রচুর ভুয়ো ভোটার আমদানি করার অভিযোগ করেছেন। ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশন কোনরকম প্রত্যুত্তর না দিয়ে কংগ্রেসকে দোষারোপ করছে। আসন্ন বিহার বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে ভোট চুরি খুব বড়ভাবে ইস্যু হিসাবে উঠে এসেছে। রাহুল গান্ধী সহ বিরোধী দলের নেতারা বিহারে মহাযাত্রা করছেন। ভোট চুরির অভিযোগ সত্যি হলে তা ভারতীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে কোন বার্তা নিয়ে আসে, তা গেম থিওরির মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন অর্থনীতিবিদ বেনস্টন জন। পড়ুন এখানে।
আন্দোলনের আটকাহন
অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত বড় শহরে গত কয়েক মাস ধরে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদ মিছিল হচ্ছে প্রত্যেক রবিবার। ৩রা অগাষ্ট ঐতিহ্যশালী সিডনি হার্বার ব্রিজে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ইস্তফা চেয়ে। তাঁদের বক্তব্য, এ গণহত্যা মানবতা বিরোধী। মানুষের প্রবল চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি সরকার সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনকে দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
স্মরণীয়
সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) বাংলার অগ্রদূত কবি। গরীব পদদলিত মানুষের উপর চিরন্তন শোষণের চিত্র তাঁর চেয়ে বলিষ্ঠ ভাবে বাংলা সাহিত্যে আর কেউ তুলে ধরতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। ১৯২৬ এর ১৫ই অগাষ্ট তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।





