৩২তম দলিল: এপ্রিল ২০২৫
কল্পনা, বাস্তব, আর রূপকের মাঝে
চিন্তা ভাবনা
এইরকমই এক এপ্রিল মাসে ১৯৪৫ সালে লাল ফৌজের ঘোড়সওয়াররা লাফিয়ে পার হয়েছিল ওডার নদী, বার্লিন আর তাদের মাঝে শেষ প্রাকৃতিক বাধা। ২-রা মে রাইখস্ট্যাগে হিটলারের শাসনের অবসান ঘটিয়ে কাস্তে হাতুড়ি খচিত রক্ত পতাকা ওড়ানোর আর ৮-ই মে নাৎসি জার্মানির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দিকে ইতিহাসের চাকা এগিয়েছিল আর কিছুটা। অথচ ঠিক তিন বছর আগেই জার্মান ভেরমাখত ছিল হাজার মাইল দূরে সুদূর সোভিয়েত মধ্য এশিয়া ও ককেশাসের দ্বার স্তালিনগ্রাদে সংগ্রামরত। তারও এক বছর আগে, ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর নাগাদ জার্মান বাহিনীর দূরবীনের নজরে ছিল মস্কোর ক্রেমলিনের সুউচ্চ চুড়া। রেড স্কোয়ার থেকে জার্মান ট্যাঙ্ক বাহিনী ছিল মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরে। সেই চুড়ান্ত পরাজয়ের মুখ থেকে রক্তমূল্য দিয়ে যে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজ, পৃথিবীর ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। শুধুই কি লাল ফৌজ ? না, শুধু লাল ফৌজ না। সমগ্র সোভিয়েত জনতা ফ্যাসিবাদের কফিনের পেরেকে তাঁদের সাধ্যমত ঘা মেরেছিলেন এই চার বছর ধরে। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের সময় যখন শহরের প্রায় পুরোটাই জার্মান বাহিনীর দখলে, তখন জার্মান সেনার জুতো পালিশ করা সতেরো বছরের কিশোর শাশা ফিলিপভ সেই পেরেকে আঘাত করেছিল তার গুপ্তচরবৃত্তির মধ্যে দিয়ে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এই সংগ্রামে নিজের প্রাণ দিতেও সে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। বেলারুশিয়ায় ছুটি কাটাতে গিয়ে জার্মান আক্রমণের মুখে বন্দুক হাতে পার্টিজান বাহিনীতে যোগ দেওয়া জিনাইদা পোর্টোনোভার বুলেটও সেই কফিনের পেরেকেই হেনেছিল আরেকটা আঘাত। এমনকি ধরা পড়ার পর নাৎসিদের পাশবিক অত্যাচারও ভাঙতে পারেনি মরণোত্তর হিরো অফ সোভিয়েত ইউনিয়ন এই স্কুল ছাত্রীর মনের জোরকে। এইরকম শত সহস্র নাম জানা, নাম না জানা সাধারণ মানুষের স্বেদ ও শোণিতের আত্মত্যাগ, যে কোন মূল্যে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার অদম্য জেদেরই ফলশ্রুতি ছিল ৪৫-এর এপ্রিল মাসে কনেভ, ঝুখভ আর রকোসভস্কির নেতৃত্বে লাল ফৌজের ওডার পেরনো লাফ।
শুধুই সোভিয়েত জনতার জেদ আর আত্মত্যাগ ? না। আপাত অপরাজেয় নাৎসি জ্যাকবুটের পদতলে থাকা ইউরোপের কোণে কোণে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সাধারণ মানুষ। এমনকি খোদ জার্মানিতে, দানবের দুর্গের একেবারে অন্তঃস্থলে গড়ে উঠেছিল প্রতিরোধ। হান্স এবং সোফি শোল, হেলমুট হুবনারের মতো কিশোর ও তরুণরা এগিয়ে এসেছিলেন ফ্যাসিবাদকে প্রতিহত করতে। যুগোস্লাভিয়ার পাহাড়ে পাহাড়ে, গ্রীসের এজিয়ানের তটে, ইতালিতে নেপেলসের গ্রাম থেকে লোম্বার্ডির শিল্প শহরে ঝলসে উঠেছিল লাল পার্টিজানদের রাইফেল। চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ফ্রান্স,নরওয়ে থেকে সিসিলি - চুড়ান্ত দমন পীড়ন করেও ফ্যাসিস্টরা এই প্রতিরোধকে থামাতে পারেনি।
নুরেমবার্গ ট্রায়াল চলাকালীন গোয়েরিং রোমান রুদেঙ্কোর প্রশ্নোত্তরের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণকে তাঁদের ‘a fatal blunder’ বলে বর্ণনা করেন। কেন ভুল ? অস্ত্র-শস্ত্র, হাতিয়ার – এইসবের হিসেব করতে তাঁদের ভুল হয়েছিল বলে ? না। গোয়েরিং নিজেই বলেন – ‘The chief thing we did not know, nor understand, was the character of the Soviet Russians. They have been and remain a riddle. The best intelligence service in the world cannot discover the Soviets’ real war potential. I don’t mean the number of guns. Aircraft and tanks. That we knew approximately. Nor have I in mind the capacity and capability of their industry. I have in mind their people.’ এই নতুন মানুষের মনের জোরেই রাতারাতি রুটির কারখানা সোভিয়েত বদলে দিয়েছিল রাইফেল ফ্যাক্টরিতে, ট্র্যাক্টরের কারখানাকে বদলে দেওয়া হয় ট্যাঙ্ক বানানোর ফ্যাক্টরিতে। এই আদর্শেই উদ্বুদ্ধ হয়ে লাল ফৌজের সৈনিকরা শপথ নিয়েছিল – ‘For us, there is no earth beyond Volga.’ সেই একই আদর্শে শ্রমিকরা ডনবাস থেকে সোভিয়েত মধ্য এশিয়ায় শিল্পকারখানা সরিয়েছিলেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায়, গৃহবধু ও স্কুল ছাত্ররা হাত লাগিয়েছিল অস্ত্র উৎপাদন আর জমির কাজে। নাৎসি বাহিনী যাতে রসদ না পায়, তা নিশ্চিত করতে কৃষকরা নিজেদের হাতে হত্যা করেছিলেন গবাদি পশু, প্যাঞ্জার বাহিনীর অগ্রগতি রোধ করতে ইঞ্জিনিয়াররা ধ্বংস করেছিলেন নিজেদের হাতে তৈরি সেতু, বাঁধ, রাজপথ। আলেকজান্দ্রোভের সুরে সোভিয়েত ইউনিয়ন শপথ নিয়েছিল ‘পবিত্র যুদ্ধ’-র। কসাক আতামান থেকে চুভাশ রমণী নাম লিখিয়েছিল পার্টিজান বাহিনীতে। বোমারু বিমান আর কামানের থেকেও সেই মানুষের প্রতিরোধ-ই নিশ্চিত করেছিল চুড়ান্ত বিজয়ের দিন।
অক্ষশক্তিকে অপরাজেয় মনে করেছিলেন অনেকেই। বিশেষ করে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সাল অবধি খুব কম ক্ষেত্রেই এই বাহিনীর গতি রুদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে। একথা অনেকেরই মনে হয়েছিল ফ্যাসিবাদের বিজয় পতাকা সমগ্র পৃথিবীতে উড্ডীন হওয়া সময়ের অপেক্ষামাত্র। কিন্তু কিছু মানুষ এই ‘সুস্পষ্ট সত্য’-কে গ্রহণ করেননি। তাঁরা অসম্ভবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। কলেজ ছাত্রী লুদমিলা পাভ্লিচেঙ্কো ইতিহাস পড়া ছেড়ে হাতে স্নাইপার রাইফেল নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন, ৫৮৮ নাইট বোম্বার রেজিমেন্টের রাইজা, ভেরা, রুফিনার মতো সাধারণ পরিবারের মেয়েরা সাবলীল ভাবে জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাস ও পলিকার্পভ পো-২ বোমারু বিমানের ককপিটে। দুঃখের বিষয়, সেই ইতিহাস বর্তমানে ভুলিয়ে দেওয়ার ও শতপ্রকার ভাবে বিকৃত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর কারণ খুব সোজা ফ্যাসিবাদের যে কবর রচনা করা হয়েছিল, গলিত জম্বির মতো সেই কবর ভেঙে তার শব এখন আবার পৃথিবীর দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জনতার হাতে গাঁথা এই শবের একটা একটা পেরেক খোলা হয়েছে যুদ্ধের অব্যহতি পরেই। একবিংশ শতকে গলিত পুঁজিবাদ নিজেকে রক্ষায় আবার বোতলের দৈত্যকে মুক্তি দিয়েছে। এখন সারা বিশ্ব জুড়ে নব্য-উদারনীতির ভেল্ভেটের দস্তানা খসে পড়েছে। তুরস্ক থেকে ব্রাজিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিলিপাইন্স ফ্যাসিবাদের লোহার বাঘ নখ এখন আর আড়াল থাকছে না। এই বাঘ নখ ঝলসে উঠছে আমাদের দেশেও। অপরদিকে এই পিশাচকে রোখার ক্ষমতা ও দায়িত্ব যাঁদের দেবী ক্লিও দান করেছিলেন, তাঁরা ছত্রভঙ্গ, মানসিক ভাবে চুড়ান্ত দ্বিধাগ্রস্ত এবং দিশাহীন। পরাজয়ের মুখ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনা অনেক দুরের বিষয়, তাঁরা পরাজিত হওয়াকেই ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছেন। ৮-ই মে এবং ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামে দেশে দেশে শত শত পার্টিজানের আত্মত্যাগের শিক্ষা তাই তাঁদের আবার আত্মস্থ করার সময় এসেছে। কি সেই শিক্ষা ? “ইতিহাসে কোন অজেয় সেনাবাহিনী নেই, কোন অজেয় শক্তি নেই এবং ছিলও না”। ১৯৪১-এর ডিসেম্বরে মস্কোর কাছে অবস্থিত জার্মান বাহিনী যখন লেনিন মুসোলিয়ামের ৩০ কিমি দূরে, তখন এমন অনেকেরই মনে হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে নাৎসি বিজয় আসন্ন ও এইখান থেকে লাল ফৌজের ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। তারপর ১৯৪৫-এর এপ্রিলেই ওডার পেরিয়ে লালফৌজ এসে উপস্থিত হয় বার্লিনের দ্বারপ্রান্তে। এই অন্ধকার সময়ে আমাদের তাই আশা ধরে রাখতে বারে বারে স্মরণে রাখা উচিৎ আলোর পথযাত্রীদের গৌরবময় ইতিহাস। শপথ নেওয়া উচিৎ – ‘তব ছিন্ন পালে জয়পতাকা তুলে তূর্য তোরণ দাও হানা।’ আমাদের মধ্যে বিশ্বাস সংক্রামিত হোক যে ধূসর এই শীতের সময় শেষে আবার বসন্ত আসবে। আবার ওডার পার হবেন আলোর পথযাত্রীরা।
রবি গুপ্ত
পড়ার মতো
ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক অদ্ভুত সময়ের সূচনা হয়েছে। ট্রাম্প অসংখ্য আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়কার কুখ্যাত USAIDও বন্ধ। USAID বন্ধ হওয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক নতুন দিকের সূচনা করবে বলে মনে করছেন ঋতব্রত চক্রবর্তী। বিশ্বায়নের অর্থনৈতিক ভাঁওতার বাইরে ভাবনাচিন্তাও সম্ভব হবে। তাঁর ইংরেজি লেখা পড়ুন এখানে (https://studycirclelokayata.blog/2025/04/30/usaid-and-the-fall-of-the-global-aid-order-ritabrata-chakraborty/)।
দেখার মতো
ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন ধারার ছবি যদি কিছু হয়, তা উদয় শঙ্করের ‘কল্পনা’। ১৯৪৮ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবি ভারতবর্ষের ভাবকে ধরার চেষ্টা করেছিল এক বাণিজ্যিক পরিকাঠামোর বাইরে। আধুনিকতার শীর্ষে থাকা এই ছবি নিজের সময়ের চেয়ে বহু এগিয়ে ছিল। এই কঠিন সময়ে ‘কল্পনা’ আবার দেখে নেওয়া বেশ ভালো কাজ।
আন্দোলনের আটকাহন
পশ্চিমবঙ্গে বহুদিন পর শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, আর বস্তি উন্নয়ন সংগঠনের ডাকে ব্রিগেড সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। অনুষ্ঠিতই বটে। বহুবছর বাদে বাংলার মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনায় এ ভূমির সবচেয়ে নিপীড়িত মানুষ উঠে এলেন। বক্তারা খুব বড় বড় কথা না বলে বললেন দৈনিক মজুরি বাড়ানোর দাবির কথা। হকের জমি ছিনিয়ে নেওয়ার কথা। বাঙালি ভদ্রলোকের সুললিত বক্তব্যের থেকে পৃথক হয়ে তৈরি হলো নতুন ভাষ্য।
স্মরণীয়
পাহালগামে সন্ত্রাসবাদী হামলায় মৃত সকলকে প্রতর্ক শ্রদ্ধা জানায়। এই ঘৃণ্য হামলা আমাদের সকলকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এই টুকুই, আবার পরের মাসে।





