৩৪ তম দলিল: জুন ২০২৫
কল্পনা, বাস্তব আর রূপকের মাঝে
চিন্তা ভাবনা
ছোট থেকে শুনে এসেছি, বাঙালি খুবই রাজনীতি সচেতন।
চায়ের ঠেক, অটোর লাইন, বা ভিড় বাস -- হেন কোনো জায়গা নেই যেখানে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা, তর্কাতর্কি হয়না। মাঝে মাঝে মোদী - মমতা ছাপিয়ে ট্রাম্প - এরডোগান অবধিও চলে যায় সেই ডিসকোর্স।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ভারতবর্ষের অন্য রাজ্যে বাংগালীদের স্টিরিওটাইপগুলির মধ্যে অন্যতম এইটি, অন্তত এখনো তাই রয়েছে। বাঙালির আত্মপরিচয় গঠন সামগ্রিকভাবে কলকাতার ভদ্রলোককেন্দ্রিক। তাতে নিম্নবর্নীয় বা আদিবাসী বাঙালিদের বিশেষ স্থান নেই। কিন্তু সে আরেক বিস্তারিত আলোচনা, পরে হবে।
কিন্তু এ রাজনীতি সচেতনতা কেবলই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কুরসি দখলের কাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। রাজনীতি বৃহৎ অর্থে সমাজে ক্ষমতার বিন্যাসকে বোঝায়। নিজের ব্যক্তিগত পরিসরও যে তুমুলভাবে রাজনৈতিক, তার ধারণা খুব একটা আমাদের বাবুদের নেই। সবচেয়ে বেশি প্রগতিশীল হিসাবে গলা ফাটানো মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে চূড়ান্ত রক্ষণশীল, এমন উদাহরণ আমাদের আশেপাশে ভুরি ভুরি। অর্থাৎ, রাজনীতিকে আত্মস্থ করতে গিয়ে সবার গণ্ডগোলটি হয়।
এবার যা বলব, উপরের আলোচনার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক। আধুনিক অর্থে শহুরে বাঙালি যাঁদের বোঝানো হয়, তাঁদের রাজনীতি সচেতনতা শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে। পশ্চিম ইউরোপে তখন জাতি - রাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার মূলভাগে রয়েছেন সে দেশগুলির শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা। ঐতিহাসিকরা যাকে middle class radicalism আখ্যা দিয়ে থাকেন। ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রিন্ট মিডিয়ার বিস্তারের কারণে যে পাবলিক স্পিয়ারের উত্থান ঘটছে, তাতে শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের খবর পাচ্ছেন, কসমোপলিটন হচ্ছেন। তার সঙ্গে এসে জুড়ছে সাম্রাজ্যবাদ - সৃষ্ট জ্ঞান। ইউরোপে এই সময়ে প্রতিবাদী ইন্টেলেকচুয়ালরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে উঠে আসছিলেন।
ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী কলকাতা মূলত বাণিজ্যিক কারণে কসমোপলিটন। বাঙালিদের বাবু - কেরানি তৈরি করতে ইংরেজি শিক্ষার পত্তন ঘটিয়ে ব্রিটিশ শাসকরা বাংলার শহরগুলিতেও এক রেডিক্যাল মধ্যবিত্ত ইন্টেলেকচুয়াল শ্রেনীর সূচনা করলেন, খানিক অজান্তেই। তবে সে শ্রেনী আয়তনে খুব বড় ছিল না। ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে যখন আদিবাসীরা কোম্পানি ও ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম চালাচ্ছেন, অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালিরাই ব্রিটিশদের চাটুকারিতা করতে ব্যস্ত ছিলেন। শুধু কিছু মানুষ অন্যান্য দেশের জাতি - রাষ্ট্র আন্দোলনের (ইতালি ও জার্মানি যার মধ্যে অন্যতম) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশ বিরোধিতা শুরু করলেন। তৈরি হলো ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের মতো নানা সংগঠন ও মঞ্চ। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ঝাঁঝ যখন ছিল অগভীর, রাষ্ট্র ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার স্পৃহা ছিল তীব্র। রাজনীতি সচেতনতার সূচনাও তখন থেকেই।
বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাংলায় মধ্যবিত্ত রেডিকালিজম চরম পর্যায়ে যায়। বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেনীর আধিক্য প্রকট হয়। কিন্তু, ১৯১১ পরবর্তী সময়ে কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লি চলে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত রেডিক্যাল ভাবনাচিন্তায় খানিক ছেদ পড়া আরম্ভ হয়। ১৯১০-২০র দশকে যে বিপ্লবী কার্যকলাপ বাংলায় দেখা যায়, তা মূলত সোভিয়েত কমিউনিস্ট ও আয়ারল্যান্ডের আনারকিস্ট বিপ্লবীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশ - পরবর্তী বাংলার মূলধারার রাজনীতি ক্রমেই সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে জড়িয়ে যায়।
১৯৪০এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলনের সময় বাংলার নানা গ্রামে মধ্যবিত্ত নেতারা উঠে আসেন এবং পার্টির নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কলকাতার উদ্বাস্তু আন্দোলনেও হিন্দু উচ্চবর্নীয় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভূতপূর্ব নেতৃত্ব দেখা যায়। তৎকালীন কংগ্রেস সরকার জমিদার - জোতদারদের কথা ভাবতে গিয়ে মধ্যবিত্তের চিন্তা থেকে খানিকটা সরে যায়। বেকারত্ব, খাদ্য সংকট, মূল্যবৃদ্ধি সহ নানা ইস্যু নিয়ে মধ্যবিত্তরা সরকারের উপর বেশ ক্ষুণ্ন হয় পড়েন। কৃষক আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও নকশাল আন্দোলনও আসলে শহুরে মধ্যবিত্তদের আন্দোলন ছিল।
উত্তাল ৭০এর দশকে জরুরি অবস্থার শেষে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। অপারেশন বর্গা, সবার জন্য শিক্ষা, ও নানা পঞ্চায়েত স্তরে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য গ্রামে জমিদার - জোতদারদের কোমর ভেঙে যায়, আর এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেনীর জন্ম হয়। পরবর্তীতে এস এস সি সহ অন্যান্য সরকারি চাকরির পথ সুগম হওয়ায় গ্রাম ও শহরতলীর মধ্যবিত্তরা আরো শক্তিশালী হন। রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা উন্নতি হওয়ায় শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনের মানও উন্নীত হয়। কিন্তু, সমস্যা রয়ে যায় অনেক। শ্রেনী চরিত্র অনুযায়ী খানিক লাভ করে যাওয়ার পরেই মধ্যবিত্তরা কমিউনিস্ট পার্টির ছত্রছায়া আস্তে আস্তে ছাড়তে থাকে।
তৃণমূল ক্ষমতায় আসে শহুরে ও গ্রামের মধ্যবিত্তের বিপুল সমর্থনে। তৃণমূল ক্ষমতায় এসেই এই শ্রেনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। সরকারের সঙ্গে শাসক দল এত গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়, যেকোনো সরকারি সুবিধার জন্য শাসক দলের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার প্রয়োজন থাকে। চাকরির সুযোগ নেই: সরকারি চাকরি বন্ধ, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় নেই। শহুরে মধ্যবিত্তরা বেশ খানিকটা বিত্তবান, তাঁদের বিশেষ কোনো কিছুর জন্য লড়াই করার প্রয়োজন নেই। তাঁদের পরিবারের ছেলে মেয়েরা বেশিরভাগই রাজ্য ছেড়ে চলে যায়, তাই তাঁদের দায়ও বিশেষ থাকেনা। ইন্টেলেকচুয়ালরাও সরকারি সুবিধাভোগী। রাজ্যে নির্বাচনের পর বোমার আঘাতে বাচ্চা মেয়ে মারা যায়। আইন কলেজে তৃণমূলের নেতারা এক ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে। অথচ মধ্যবিত্ত রেডিক্যালিজম এর কোনো চিহ্নমাত্র দেখা যায় না। রাজনৈতিক সচেতনতা খালি মুখের বুলি হয়ে থেকে যায়।
বাংলায় মধ্যবিত্তের বৈপ্লবিক যুগ সমাপ্ত। তাঁদের উপর ভরসা করে রাজনীতি এগোলে রাজ্য শুধুই পিছনের দিকে যাবে। সত্যিকারের শ্রমিক কৃষক ক্ষেতমজুর সহ পশ্চিমবঙ্গের গরিবকে সংগঠিত না করতে পারলে রাজ্য আরো ভয়াবহ নরক কুন্ডে পরিণত হবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
অনন্য চক্রবর্তী
পড়ার মতো
দুই বাংলার রাজনীতি আজ কণ্টকবিদীর্ণ। দূরদর্শিতা ও আদর্শহীন নেতাদের ভিড়ে জনগণ চিরে চ্যাপ্টা। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ক্রমেই মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে। একশো বছর আগে বাংলায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি হিন্দু মুসলমানের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে ভালো বুঝতেন। সর্ব স্তরের বাঙালির উন্নতিসাধন সম্ভব করতে চেয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁকে নিয়ে ঐতিহাসিক অনিকেত দের লেখা পড়ুন উপরে।
শোনার মতো
ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার বলেছিলেন, ইতিহাসের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক আফিমের সঙ্গে আফিমের নেশাখোরদের মতো। ঐতিহাসিক তনিকা সরকার হিন্দুত্ব ও তার ইতিহাস চর্চা করলেন এই আলোচনায়। ভারতে তথা বাংলায় কিভাবে হিন্দুত্ব চিন্তার উত্থান ঘটেছিল, তার সঙ্গে বর্তমানে আর এস এসের রাজনীতির কোথায় সম্পৃক্ততা, সমস্ত উঠে আসে এই আলোচনায়।
আন্দোলনের আটকাহন
নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রাইমারি জিতে লড়াইয়ে অনেক টাই এগিয়ে গেলেন ৩৩ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত জোহরান মামদানি। মামদানি নিজেকে ডেমোক্র্যাটিক সোস্যালিস্ট বলেন, এবং মেয়র হলে সস্তা গণপরিবহণ, বাড়ি ভাড়া না বাড়ানো, ভাড়াটেদের অধিকার স্থাপন সহ নানা প্রগতিশীল প্রকল্প রূপায়ণ করবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁকে বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী দের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। তাও তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কে গ্রেফতার করবেন, আর মোদি এক যুদ্ধ অপরাধী। তাঁর জয় প্রমাণ করে, এখনো মানুষের মূল রুজি রুটির ইস্যু গুলি তুলে ধরলে তাঁদের সমর্থন পাওয়া সম্ভব।
স্মরণীয়
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৯) বাংলা তথা ভারতবর্ষের অগ্রগণ্য সংগীতস্রষ্টা ও গায়ক। দীর্ঘদিন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কাজ করেছেন গ্রামে গঞ্জে মানুষের মাঝে। তিনি ১৯২০ সালের ১৬ই জুন বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন।
এই টুকুই, আরো পরের মাসে।





