৩০তম দলিল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫
কল্পনা, বাস্তব, আর রূপকের মাঝে
আমেরিকা থেকে আরামবাগ, বেশিরভাগ মানুষ ভালো নেই। বাঁচার মত বাঁচতে ন্যূনতম যেটুকু যা প্রয়োজন, তা জোটানোই কঠিন হয়ে উঠছে। আগেকার মতো করে ভাবলে আজকের দিনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নতুন ভাবনা প্রয়োজন। এতোদিন ধরে যা যা জানি, তা সব আবার নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের আগে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের পথের পথিক হতে হবে। কিন্তু তাঁদের নকল করার চেষ্টা করলে তা হঠকারী হবে। এইবারের প্রতর্কতে নতুনের সঙ্গে পুরোনো ভাবনার মেলবন্ধন ঘটেছে। পড়ে দেখুন, আমাদের জানান কেমন লাগলো।
চিন্তা ভাবনা
তাসের দেশে নির্বাচন হবে। প্রার্থী হলেন হরতনের সাহেব, বিবি, গোলাম ও টেক্কা। ভোটদাতারা হরতনের ২ থেকে ১০। এই নির্বাচনে প্রতিটি নির্বাচক প্রার্থীদেরকে নিজস্ব পছন্দসই ক্রমে সাজাবেন। যেমন, ৫-এর পছন্দ-ক্রম হল: গোলাম, টেক্কা, বিবি, সাহেব। অর্থাৎ, তার সবচেয়ে পছন্দ গোলামকে, তারপর টেক্কা, ইত্যাদি। সবাই ভোট দেওয়া হলে প্রশ্ন হচ্ছে, কিভাবে সকলের মতের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রার্থীদের একটি চূড়ান্ত ক্রমে সাজানো যায়। ভোটারদের ভোট যেরকম খুশি হতে পারে কিন্তু এই চূড়ান্ত ক্রমের কিছু কল্যাণমূলক বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত। যেমন --
(ক) যদি সকল নির্বাচকই বিবিকে সাহেবের চেয়ে বেশি পছন্দ করে, চূড়ান্ত ক্রমে বিবিকে সাহেবের আগে জায়গা দিতে হবে।
(খ) চূড়ান্ত ক্রমাঙ্কে সাহেব ও বিবির আপেক্ষিক স্থান নির্ধারিত হবে কেবলমাত্র ভোটারদের পছন্দ-ক্রমে সাহেব ও বিবির আপেক্ষিক স্থান দেখে, সেখানে কোনও তৃতীয় প্রার্থীর প্রভাব পড়বে না।
(গ) চূড়ান্ত ক্রম এমন হতে পারে না যা বাকি ভোটারদের উপেক্ষা করে শুধুমাত্র একটি বিশেষ ভোটারের পছন্দের ক্রমেই সাজানো হবে।
এই সহজাত বৈশিষ্ট্যগুলি গণতন্ত্রে কাম্য হলেও হয়ত খানিক অপ্রত্যাশিতভাবে ১৯৫১ সালে মার্কিন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ কেনেথ অ্যারো গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন যে এরকম কোনও নিয়ম থাকা অসম্ভব যা উপরের তিনটি নিয়মকে একসঙ্গে পূরণ করে। আরো এক নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন পরবর্তীকালে অ্যারোর অসম্ভবতা উপপাদ্যকে (impossibility theorem) আরও সাধারণ রূপে প্রমাণ করেন, যা থেকে প্রশ্ন ওঠে: গণতন্ত্রে কি তাহলে নির্বাচনের ভূমিকা সীমিত?
জনকল্যাণ অর্থনীতির (Welfare Economics) শাখা সামাজিক পছন্দ তত্ত্বে (Social Choice Theory) গবেষণার বিষয় হল বহু মানুষের পছন্দ-অপছন্দের সমন্বয় ঘটিয়ে সমাজের সবার ভালোর জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া। এর উৎপত্তি প্রায় দুই শতাব্দী আগে, প্রধানত রাষ্ট্র দর্শনের বিভিন্ন প্রশ্নের গাণিতিক উত্তরের সন্ধানে। এখানে উল্লেখ্য যে এটি ক্রীড়া তত্ত্বের (game theory) থেকে আলাদা। ক্রীড়া তত্ত্বের উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন যুক্তিবাদী ‘এজেন্ট’এর আচরণ ও তার ফলাফল বিশ্লেষণ করা। কিন্তু সামাজিক পছন্দ তত্ত্বে গুরুত্ব পায় (১) নির্বাচন, (২) দুই পক্ষের এমনভাবে এক হওয়া যেখানে দুই ‘এজেন্ট’ই তাদের পছন্দসই সঙ্গীর সঙ্গে থাকতে পারে, (৩) একটি বৃহৎ রাজ্যকে কিছু নির্বাচনক্ষেত্রে বিভক্ত করা সম্ভব কিনা যাতে এক বিশেষ প্রার্থী সবসময় জয়ী হন।
সাম্প্রতিককালে কম্পিউটার বিজ্ঞান গবেষকদের একাংশ সামাজিক পছন্দ তত্ত্বের প্রশ্নগুলির উত্তর কম্পিউটার অ্যাল্গোরিদিম-এর মাধ্যমে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। যেমন গত বছর তাঁরা প্রমাণ করেন, সবসময় এরকম ৬ জন প্রার্থী থাকবেই যাদেরকে অন্য যে কোনও প্রার্থীর চেয়ে বেশিরভাগ ভোটার পছন্দ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কম্পিউটার বিজ্ঞানের সব থেকে বড় সাফল্যগুলির মধ্যে একটি। তাই, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক পছন্দ তত্ত্বের মেলবন্ধনে নতুন পথের দিশা পাওয়া সম্ভব কিনা যা মানুষের জীবনে কল্যাণকর হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জীবনের বহু ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বহু-রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি সহ নানা বেসরকারি সংস্থা কর্মী নিয়োগ শুরু করেছে। কিন্তু নিয়োগকারী ‘এ.আই. মডেল’গুলি আদতে পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বানানো। যেমন, বহু কর্মক্ষেত্রে মহিলা নিয়োগের হার খুব কম বলে সেই জায়গায় মহিলাদের পারদর্শিতার ওপর বিশেষ তথ্য নেই। সেইজন্য মহিলাদের বিষয়ে এ.আই. মডেলগুলির সিদ্ধান্ত প্রায়শই ভুল হয়।আমাজন ২০১৮ সালে কর্মী নিয়োগে এ.আই. মডেলের ব্যবহার বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই উদাহরণ থেকে এ পরিষ্কার হয় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ঘটা পক্ষপাত এক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা যা সমাজে বহু মানুষকে প্রভাবিত করে। তাই প্রয়োজন সামাজিক পছন্দ তত্ত্বের সাহায্যে পক্ষপাত ও তার কারণে সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির এক গাণিতিক সংজ্ঞা বানানো, যা কাজে লাগিয়ে এ.আই. মডেলগুলি নিরপেক্ষ কিনা নির্ধারণ করা যাবে। বস্তুত, সামাজিক পছন্দ তত্ত্বই পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এক সার্বজনীন প্রযুক্তি করে তুলতে।
পক্ষান্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির সাহায্যে সামাজিক পছন্দ তত্ত্বে নতুন দৃষ্টিকোণ আনা সম্ভব। ডেটা সায়েন্স বা উপাত্ত বিজ্ঞানের দ্বারা প্রতিটি মানুষ সম্বন্ধে বিভিন্ন রকম তথ্য সংগ্রহ করা ও সেই তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। সামাজিক পছন্দ তত্ত্বেও মানুষের পছন্দ-অপছন্দ বোঝার জন্য নানারকম তথ্যের ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু শাস্ত্রীয় সামাজিক পছন্দ তত্ত্বে হয়ত খানিকটা অবাস্তবভাবেই মানুষের পছন্দ ক্রমাঙ্ক বা একটি সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়, যদিও প্রকৃতপক্ষে মানুষের পছন্দের নানারকম দিক রয়েছে। কিছু মানুষ ভোটদান করেন কোন প্রার্থী তার দৈনন্দিন জীবনের মুশকিল আসান করবেন সেই ভেবে। আবার কোনো মানুষ ভোটদান করেন কোন প্রার্থী তার ধর্মকে গৌরবান্বিত করবেন সেই ভেবে। মানুষের পছন্দের এই সমৃদ্ধ রূপ উপাত্ত বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে বোঝা সম্ভব।
বর্তমানে এ.আই. মডেলগুলি প্রস্তুত করতে প্রচুর কম্পিউটার-শক্তির প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি কিছু বহুজাতিক সংস্থার হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। তারাই গবেষণার বিষয় ঠিক করে। ফলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণা ভীষণভাবে পুঁজিবাদী হয়ে উঠেছে। এর লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ নয়, বরং কোম্পানিগুলির লাভ বাড়ানো। কিন্তু এই প্রযুক্তি এতটাই মৌলিক যে সমাজে তার প্রভাব অনস্বীকার্য ও গুরুতর। তাই দরকার সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের মিলনে আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা। এর এক দিক হল সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ঘটিয়ে সকলের জীবন আরও মঙ্গলময় করে তোলা।
২০২৪ সালের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমগ্লু নব-উদারপন্থি অর্থনীতির সমালোচনা করে বলেছেন, মানুষ কেবলই গ্রাহক নয়। বরং সে সমাজে অংশগ্রহণ করতে চায়। কিন্তু পুঁজিবাদী চেতনায় মানুষ শুধুই গ্রাহক, তাই পুঁজিবাদের অধীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণা কোনদিন সামগ্রিক উন্নতির দিশা দেখাতে পারবে না। বরং প্রয়োজন সামাজিক পছন্দ তত্ত্বের মত বিষয়সূচি, যার প্রয়োগে শুধুমাত্র সমাজে শ্রেষ্ঠতর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়াও গণতন্ত্রকে নতুন করে কল্পনা করা সম্ভব। এর মূলে থাকবে বিজ্ঞান ও দর্শন। এটিই বর্তমান সময়ের চাহিদা।
নির্ঝর দাস
পড়ার মতো
১৪৪ বছর পর মহাকুম্ভ স্নান — বিজেপি - আরএসএস প্রচালিত ভারতীয় রাষ্ট্র যন্ত্রের এই নির্মম ভাঁওতার শিকার হলেন অসংখ্য গরীব মানুষ। কত মানুষের সমাগম হতে পারে, তা সম্পর্কে উত্তরপ্রদেশ সরকার দিশাহীন ছিল। বড়লোক সেলিব্রিটিদের সেবা করতে গিয়ে সাধারণ গরীবের কথা কোনোভাবেই যে ভাবা হয়নি, তা স্পষ্ট। চাপাচাপি - দৌড়দৌড়িতে অনেকেই মারা গেছেন। বিজেপি নেতারা অবশ্য তাঁদের স্বর্গে যাওয়া নিয়ে নানা থিওরি নামানো শুরু করেছেন। উত্তর ভারতের নানা স্টেশনেও একই রকম ভাবে অনেকে মারা গেছেন। তা নিয়ে সুভাষ গাটাডের লেখা পড়ুন এখানে।
দেখার মতো
প্রখ্যাত সাংবাদিক রবিশ কুমার শান্তিনিকেতনে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বাড়িতে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। দুই বাগ্মীর আলোচনায় উঠে এসেছে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বৌদ্ধ ধর্ম, ভারতের সর্বধর্ম সমন্বয়, রবীন্দ্রনাথ - গান্ধীর ভারতচিন্তা সহ নানা বৌদ্ধিক প্রসঙ্গ। সাক্ষাৎকারটি আমাদের সমসাময়িক ইতিহাসের একটি দলিল হিসাবে থেকে যাবে।
আন্দোলনের আটকাহন
নদী বাঁচাও জীবন বাঁচাও আন্দোলন, যৌথ জীবনযাপন, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ, পরিবেশবান্ধব মঞ্চ ব্যারাকপুর, কুশকর্ণী নদী সমাজ, প্রকৃতি বাঁচাও আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ, জল জমি জঙ্গল, বিজ্ঞান দরবার কাঁচরাপাড়া, জলঙ্গি নদী সমাজ, গাড়ুই নদী সমাজ কল্যাণপুর, গ্রিন নাগরিক কলকাতা, সিঙ্গারন নদী বাঁচাও কমিটি, নদীয়া নেচার ফার্স্ট, নদীয়ার যুগবার্তা, যুব ভারত, থার্ড প্ল্যানেট, হাওড়া যৌথ পরিবেশ মঞ্চ, বেহালা পরিবেশ গোষ্ঠী সহ অন্যান্য সহমর্মী সংগঠনের উদ্যোগে বীরভূমের ময়ূরাক্ষী নদীর উপর তিলপাড়া ব্যারেজ থেকে কলকাতা অবধি ১২ দিন ব্যাপী সাইকেল মিছিল সংগঠিত হলো। দক্ষিণবঙ্গের ৯টি জেলা জুড়ে এই মিছিল ছোট বড় অসংখ্য নদীকে ছুঁয়ে গেলো। নদীবক্ষ থেকে অবৈধভাবে বালি তোলা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও নাগরিক বর্জ্যের কারণে নদী দূষণ ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মতো নানা বিষয় উঠে এলো এই কর্মসূচিতে। প্রকৃতিকে বাঁচানোর লড়াই রাজনৈতিক - সামাজিক সংগ্রামের থেকে পৃথক নয়, আয়োজকরা এ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। পড়ুন এখানে।
স্মরণীয়
জাকিয়া জাফরি (১৯৩৮-২০২৫) আরএসএস - বিজেপি সংগঠিত ২০০২ এর গুজরাট দাঙ্গায় নিহত প্রাক্তন সাংসদ এহসান জাফরির স্ত্রী। তিনি নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন গুজরাট সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই লড়েছিলেন। ভারতে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াইয়ে জাকিয়া এক জ্বলন্ত অঙ্গার। ১লা ফেব্রুয়ারি বয়সজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর লড়াই সম্পর্কে পড়ুন এখানে।
আসছি পরের মাসে আবার। এই মাসে এই অবধিই থাকুক।





