২৮ তম দলিল: ডিসেম্বর ২০২৪
কল্পনা, বাস্তব ও রূপকের মাঝে
নতুন বছর শুরু হবে। অসংখ্য আশা আকাঙ্খা নিয়ে। খুব বিশেষ কিছু বলার নেই। সকলের ভালো সময় কাটুক। নিজেদের পরিবার পরিজনের সঙ্গে, এই কামনা রইলো মাদের তরফ থেকে। আমাদের কাজকে সমর্থন করতে থাকুন। আরো নতুন লেখা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। উৎসবের মরশুম ভালো কাটুক।
চিন্তা ভাবনা
১৮৮০র দশকে বাঙালির শরীরচর্চার উদ্যোগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে উনবিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে একশ্রেনীর বাঙালি যখন চাটুকারিতাকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে মনে করে পাশ্চাত্য আধুনিকতার ধারণাকে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করছে তখনও পর্যন্ত বাঙালির আত্মগৌরব ছিল প্রাচ্যবাদীদের গবেষণার বিষয়বস্তু। একথা সর্বপ্রথম বঙ্কিমচন্দ্র ও রাজনারায়ণ বসুর লেখা থেকেই সুস্পষ্ট যে বাঙালির স্বজাত্মবোধ ছিল সুপ্ত। বাঙালি বাবুসমাজের অদম্য বিলাসব্যাসনের প্রতি মোহ, কলকাতার কাপ্তেন বাবুদের অমিতব্যায়ী আচরণ থেকে যার আভাস পাওয়া অতি সহজেই সম্ভব। অন্যদিকে পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিক সমাজের যে চারিত্রিক অধঃপতন ঘটেছিল তা অত্যন্ত স্পষ্ট রাজনারায়নের ভাষ্যে। অনিয়মিত জীবন, আর অপরিমিত মদ্যপান কেই যখন বাঙালি পাশ্চাত্যসমাজে প্রবেশাধিকার হিসেবে গণ্য করলে আরেক শ্রেনীর মানুষ তার বিরুদ্ধে পথে নামলেন।
এমতাবস্থায় সাধারণ নাগরিকের চরিত্রের উন্নতিসাধন আশু লক্ষ্য হয়ে উঠলো। অধ্যাপক জন রোসেলী বিগত শতাব্দীতে লেখা তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ন নিবন্ধ The Self-Image of Effeteness: Physical Education and Nationalism in the Nineteenth Century Bengal এ উল্লেখ করেছেন ১৮৫০-১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত উচ্চবিত্ত বাঙালি হিন্দুদের একমাত্র সংজ্ঞা ছিল তারা মূলত চাকুরীজীবি সম্প্রদায় তাদের প্রতিনিয়ত দৈহিক দৌর্বল্যের কারনে সামাজিক লাঞ্ছনাই ছিল তাদের ভবিতব্য। তার একটা অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায়, শিক্ষায়, সৌন্দর্য্যে বাঙালি নিজেদের যতই সর্বোত্তম মনে করুক না কেন বিদেশী ঔপনিবেশিকদের চোখে বাঙালি ছিল চিরকালীন খর্বকায় জাতি ও গনতান্ত্রিক রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ। বাংলায় সামগ্রিক ভাবে শরীরচর্চার সংস্কৃতি আসার আগে তা ছিল মূলত শহর কলকাতার কিছু বনেদী কাপ্তেন বাবুদের অবসর যাপনের উপাদান।
১৮৬৫ থেকে প্রতি বছর হিন্দু মেলা উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত মেলায় সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়ামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। হিন্দুমেলার জাতীয়তাবাদী মঞ্চ হিসেবে ব্যবহারকে ঘিরে বিতর্কের অন্ত নেই। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ন বিষয় হল, প্রতি বছর এই ভাবে একটি প্রতিযোগিতার ধাঁচে লাঠিখেলা আয়োজন বাঙালির অবচেতনে তার দৌর্বল্যে কুঠারাঘাত করে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, জার্মান কুস্তিগির ইউজেন স্যান্ডো ১৯০১ সালে প্রথম রয়্যাল এলবার্ট হলে শক্তি প্রদর্শন করেন। অন্যদিকে, তারও ৩৩ বছর আগে হিন্দুমেলার প্রতিষ্ঠা ও বাঙালির শক্তি প্রদর্শন একটি যুগের নির্ঘোষ। নবগোপাল মিত্রের আখড়া স্থাপন, এবং ১৮৭৬ সালে বিপিন চন্দ্র পালের গুপ্ত সমিতি স্থাপন বাঙালির শরীরচর্চার সংস্কৃতিকে ঘরের আঙিনা থেকে এনে পর্যবসিত করল বিশ্বের দরবারে।
উনবিংশ শতকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একেবারে গোড়ার দিকে বাংলার বিপ্লববাদের সূতিকাগার ছিল ব্যায়ামের আখড়া। কলকাতা শহরে ব্যাপক হারে আখড়া তৈরি করে ব্যায়াম শিক্ষার প্রচলন ঘটে ১৯০১-১৯০২ সালের মধ্যেই। যে নামটি প্রথমেই আসে তা হল অনুশীলন সমিতি। যাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালির দুর্বল তনুর নিরসন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ব্রাহ্মমুহূর্তে পথচলা শুরু করে অনুশীলন সমিতি ছিল একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে বাংলায় একাধিক গুপ্তসমিতির প্রতিষ্ঠার সোপান। বিপ্লবী বারীন ঘোষ এর জবানি থেকে জানা যায়, অনুশীলন সমিতির জন্মলগ্নে তিনি বিভিন্ন জেলা থেকে জেলা ঘুরে ব্যায়ামাগার তৈরি করেছিলেন, বলা বাহুল্য তাঁকেই সিডিশন কমিটি বাংলায় সমিতি স্থাপনের অন্যতম কারিগর হিসেবে ভূষিত করেন। তাছাড়া বিভিন্ন সরকারী প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্ট বারীন ঘোষের আগেও ১৮৭০ থেকে ১৯০২ পর্যন্ত একাধিক সমিতির কার্যকলাপ অব্যাহত ছিল। প্রাথমিক পর্বে এরা কার্যকলাপে দৈহিক উন্নতিসাধনে নিবৃত হলেও পরবর্তীতে এদের রূপান্তর ঘটে রাজনৈতিক অভিমুখ প্রকাশের মাধ্যমে। ১৯০১ সালে কলকাতায় আত্মন্নোতি সমিতি প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। যদিও প্রথমে এটি স্থাপিত হয় ওয়েলিংটন স্কোয়ারের খেলাতচন্দ্র ইন্সটিউশনের বাড়িতে। বিপ্লবী শতীশ্চন্দ্র দের জবানিতে সমিতির পরিবেশের একটি চিত্র পাওয়া সম্ভব, “কয়েকজন বালক যুবক, তাদের অনেকে বাঁশের লাঠি ঘোরাচ্ছে, বা পরস্পর মারের খেলা খেলছে। কেউ কেউ হাতে গ্লাভস পরে পরস্পর বক্সিং লড়ছে, কেউ ছোরা খেলছে, কেউ বা কুস্তি লড়ছে” প্রাথমিক পর্বে এই সমিতি ৩০ জন সভ্যকে নিয়ে তৈরি হলেও পরে সভ্য সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এর শাখা প্রসারিত হয় বিভিন্ন অঞ্চলে।
এর পরে আসছি আরেকটি শরীরচর্চা কেন্দ্র: ১ শংকর ঘোষ লেন। প্রথমেই নবগোপাল মিত্রের কথা উল্লেখ করেছিলাম, এই ঠিকানাতেই তিনি তার ব্যায়ামাগার স্থাপনা করেন। ব্যক্তিগত স্তরে যারা ব্যায়াম-লাঠি চালনা বা কুস্তি চর্চা করতেন, ব্যারিস্টার প্রমথ মিত্র তাদের মধ্যে অন্যতম। বারীন ঘোষ প্রমথ মিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁর মন্তব্যে জানিয়েছিলেন, “তাকে আমরা বলতাম বাঘা মিত্তির, কারন তাঁর দেহটি ছিল মাংসল, দৃঢ়পেশি, গুন্ডামার্কা”। প্রমথ মিত্র যে নবীন যে কোন বিপ্লবীর তুলনায় লাঠি খেলায় বেশ দড় ছিলেন তাঁর আরেকটি প্রমান মেলে বারীন ঘোষের ওপর এক মন্তব্যে, “এক দিন তাঁর হাতে ক্ষিপ্র ও বিদ্যুৎগতিতে চালানো বড় লাঠির এক ঘা মাথায় খেয়ে আমার কপালটা গেল নৈনিতালী আলুর মত ফুলে। লোকলজ্জার জ্বালায় অতি গোপনে সন্তর্পণে আহত স্থানটা চুলকানো ছাড়া আর কোন চিহ্নই আমি দেখলাম না”।
এবার আসি বিপ্লববাদের ধাত্রী ভূমি প্রেসিডেন্সি কলেজের সন্নিহিত ইডেন হিন্দু হোস্টেলের প্রসঙ্গে। বিপ্লবী সতীশচন্দ্র দের এক জবানী শুনলে একটা বিষয় পরিস্কার হতে বাধ্য, একদিকে বাঙালি যুবকবৃন্দ শিক্ষার পাট চুকিয়ে বিপ্লবের রাস্তা বেছে নিলেও অন্যদিকে সামগ্রিক বৈরিতাকে ভুলে না গিয়েও বীরের যথাযথ সম্মান যে প্রাপ্য কলেজ পড়ুয়া ছেলেপুলেরা বাহুবলকে কেন্দ্র করে, তা প্রমান করেছিল। যদিও তারা তাদের পিতৃপুরূষের হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারে ছিল সচেষ্ট। “আত্মন্নোতি, যুগান্তর আর অনুশীলন-প্রধানতঃ এই তিনটি বিপ্লবী দলের ছেলেতে হিন্দু হোস্টেল ও প্রেসিডেন্সী কলেজ হয়ে গেছিল মৌচাকের মত। কতদিন কত কত অস্ত্রশস্ত্র লুকানো থাকত হোস্টেল বোর্ডার দের কাছে। মিস্টার জেমস ছিলেন জবরদস্ত প্রিন্সিপ্যাল। স্বাধীনচেতা উদারমন ইংরেজ, জীবনে যাদের দেখেছি, জেমস সাহেব ছিলেন তাদের একজন। তাঁর কথা সশ্রদ্ধ ভাবে স্মরন না করে পারিনা তা ইংরেজদের সঙ্গে যতই বৈরীভাব হোক।পরে কলেজ জিমন্যাসিয়ামে তাঁর সঙ্গে কত ব্যায়াম করেছি, হাতে বক্সিং গ্লাভস এঁটে তাঁর সঙ্গে বক্সিং করতে ঘুষাঘুষি লড়েছি”।
বিংশ শতকে নিজ প্রচেষ্টায় ব্যায়ামবীর হিসেবে প্রভূত ক্ষ্যাতিলাভ করেন যতীন্দ্রচরন গুহ বা গোবর গুহ। গোবর গুহই বিংশ শতাব্দির প্রথম ভারতীয় যিনি বিদেশে বাঙালির দুর্বলতনু বদনাম ঘোচাতে সমর্থ হন। লেখক অনিল চন্দ্র সেন তাঁর ব্যায়ামে বাঙালি গ্রন্থে একটি বিলাতী কাগজের তর্জমা উল্লেখ করেছেন যেখানে গোবরবাবুর বর্ননা তিনমন ওজনের বালক গোবর, সে গলায় দুই মন ওজনের হাসুলি পরিহিত। তাঁর ছয় বছরের আমেরিকা ভ্রমনের কালে বহু পালোয়ান কে ধরাশায়ী করলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় ভারতীয় তথা বাঙালির জাতীয়তাবাদের স্ফুলিঙ্গকে উগ্রশির করতে গোবর গুহের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ন। বাঙালির স্বাস্থ্যদ্ধারের অন্যতম মূলমন্ত্র হিসেবে তাঁর পরামর্শ ছিল Massage বা দলাইমলাই।
দেবরাজ ঘটক
পড়ার মতো
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমার জীবনকে প্রভাবিত করছে। অনেকেই দৈনন্দিন কাজের জন্য এ আই এর সাহায্য নিচ্ছেন। আপাতত দৃষ্টিতে স্বাপদসঙ্কুল না হলেও, এ আই এর নেপথ্যে রয়েছে অজস্র কপিরাইট লঙ্ঘনের কাহিনী। বিখ্যাত বামপন্থী চিন্তক নোয়াম চমস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, এ আই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুচির বালাজি চ্যাটজিপিটির মালিক বহুজাতিক সংস্থা ওপেনএআইএর বৃহৎ তথ্য চুরির ঘটনাগুলিকে জনসমক্ষে এনেছিলেন। অবৈধ ভাবে তথ্য চুরি করা ছাড়াও ভুলভাবে এ আই মেশিনগুলিকে ট্রেন করা, ভুয়ো তথ্য সরবরাহ করা ইত্যাদি নিয়ে সরব হয়েছিলেন সুচির। কিছুদিন আগে তাঁর বাড়িতে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যু নিঃসন্দেহে রহস্যময়। তাঁর পরিবার ইতিমধ্যেই এফ বি আইকে তদন্তের জন্য অনুরোধ করেছেন। সুচিরের মৃত্যু ও তাঁর কাজ নিয়ে এই লেখা পড়ুন এখানে।
আন্দোলনের আটকাহন
বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা নিয়ে বিপুল দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচুর ছাত্র ছাত্রী আন্দোলনে নেমেছেন। সরকারি চাকরিবাকরি কম, তার উপর পরীক্ষা ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার মতো কাণ্ডে ছাত্র ছাত্রীরা বিপুল ভাবে প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। সেই প্রতিবাদের আঁচ এসে পড়েছে দিল্লিতেও। পড়ুন এখানে।
স্মরণীয়
জাকির হুসাইন (১৯৫১-২০২৪) ও শ্যাম বেনেগল (১৯৩৪-২০২৪)। জাকির আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন তবলাবাদক ও শ্যাম বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক। দুজনেই ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
এখন এই অবধি। নতুন বছর আবার দেখা হবে।






