২৫ তম দলিল: সেপ্টেম্বর ২০২৪
কল্পনা, বাস্তব, আর রূপকের মাঝে
পুজো আসছে। অথচ কারুরই মনে তেমন উচ্ছ্বাস নেই। কলকাতার রাস্তায় প্রাণের সেই চেনা স্পন্দন তেমন দেখা যাচ্ছেনা। তিলোত্তমার নৃশংস হত্যা আর দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়ানক বন্যা পরিস্থিতির জন্য সবটাই কেমন হয়ে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যতই উৎসবে ফিরতে বলুন, মানুষ এবার প্রতিবাদে মুখর হবেনই। প্রতিবাদই শোষিতের উৎসব — লেনিনের এই উক্তিকে সম্বল করে মানুষ মহালয়া ও পুজোর সময়ে পথে নামবেন। উন্নততর সমাজ গঠনের লক্ষ্যে। মানুষের আন্দোলনকে সমর্থন করুন, বন্যা বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ পাঠাতে সাহায্য করুন। সাবধানে থাকুন, উৎসবের মরশুমে মানুষের পাশে দাঁড়ান। এইটুকুই।
চিন্তা ভাবনা
প্রায় দু'মাস হতে চললো। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, এমনকি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে যে সমস্ত মানুষ সারাদিনের খাটাখাটনির পর রাতটুকু শান্তিতে ঘুমোতে চান আগামীদিনের কাজের জন্য শক্তি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে, তাঁদের মধ্যে বহু মানুষ রাত জাগছেন, রাত দখল করছেন, অফিস ফেরতা মিছিল কিম্বা অবস্থান হয়ে বাড়ি আসছেন, বিশেষ একটা আইনের খুঁটিনাটি না বুঝলেও সুপ্রিম কোর্টের লাইভ স্ট্রিমিং এর লিঙ্ক হন্যে হয়ে খুঁজছেন। এঁরা কেন এরকম করছেন, তাও আমাদের অজানা নয়।
কিন্তু, প্রশ্ন সেই রয়েই যায়। "রোজ কতো কি ঘটে যাহা তাহা, এমন কেন সত্যি হয়না, আহা?" কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা তো নিত্যদিনের বিষয়, এমনকি যৌন হেনস্থা, খুন জখম, রাজনৈতিক মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীদের আধিপত্যবাদ, চুরি, ডাকাতি, তোলাবাজির বলয়, কোনোটাই মানুষ এই প্রথম দেখছেন বা অনেকদিন পর হঠাৎ দেখছেন, তা নয়। বহুদিন পর দেখা যাচ্ছে এক স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবাদ।
কিন্তু, কেন? হয়তো সচরাচর যৌন হেনস্থা এবং পরবর্তীতে খুন, তাও সরকারি কর্মক্ষেত্রে, তাও আবার উচ্চশিক্ষিত, পরিশীলিত ডাক্তারের সঙ্গে রাজ্যের রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ঘটে না। অথবা ঘটে, আমরা হয়তো জানিনা, তাই প্রতিবাদ করিনা। অথবা জানি, তবুও প্রতিবাদ করিনা। প্রতিবাদের খুঁটিনাটি নিয়ে খুঁত বাছতে বসাই যায়, কার কি ব্যক্তিগত এজেন্ডা, যোগ দেওয়ার পেছনে কি উদ্দেশ্য, এসব নিয়ে কথা বললেই বলা যায়। তবে সে নিয়ে অনেক কথা বলাও হয়েছে আজ পর্যন্ত, সেই ১৯৯২ এর ভানোয়ারি দেবীর ঘটনা থেকে ১৯৯৮ এর বিশাখা গাইডলাইন থেকে ২০১২র নির্ভয়া কান্ড থেকে ২০১৩ র ভর্মা কমিটি গাইডলাইন। কিন্তু, কথামতো কাজ বিশেষ হয়নি। তাই কথার গুরুত্ব ক্রমশঃ কমিয়ে কাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর্যায়ে আমরা চলে এসেছি।
কি করণীয় তবে? কিভাবে এই মেহিকান স্ট্যান্ডঅফ্, কিম্বা অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব? সম্পূর্ণ উত্তর অবশ্যই আমার জানা নেই। তবে, কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ, অতি অবশ্যই যে বা যাঁরা পাকাপাকিভাবে কিম্বা চুক্তিভিত্তিকভাবে চাকরি ছাড়াও কোনো সংস্থায় প্রশিক্ষনার্থী হিসেবেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের POSH আইনের আওতাভুক্ত করা। এই পদক্ষেপ কার্যকরী হলে কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা বাড়বে। দ্বিতীয়তঃ, সরকারি গণপরিসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বদলে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা। তৃতীয়তঃ, সরকারী উদ্যোগে নাইট বাস তথা মধ্যরাতে নিরাপদ ভাবে যাতায়াতের জন্য যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থাপনা করা। এছাড়াও, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সঠিকভাবে বিশাখা গাইডলাইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা মোকাবিলা করার কমিটি গঠন করা। খোঁজ করলে দেখা যাবে, হয়তো সব সংস্থাতেই এমন একটি কমিটি নামে রয়েছে, কামে নেই। তাই, সেই সব কমিটি বাতিল করে, নতুন করে কার্যকরী কমিটি গঠন করার প্রয়োজন রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সুরক্ষার প্রশ্নে সিসিটিভি ছাড়াও অন্যান্য সমাধানসূত্রের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। যেমন মহিলা কর্মচারীদের বায়োমেট্রিক পরিচালিত বিশ্রামকক্ষ এবং বাথরুম, বা ইমার্জেন্সী হেল্পলাইন নম্বর, যেখানে তাঁরা একটুও সন্ত্রস্ত বোধ করলে তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করে সাহায্য পাবেন।
তবে সর্বোপরি দেখার বিষয়, এত কিছু করেও কি এই সমস্যা মিটবে? সম্ভবতঃ না। কিছুটা ভয়াবহতা কমবে, তবে মিটবে না। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ভয়াবহতা কমাই বা কম কি? কিন্তু, এই তাৎক্ষণিক ভয়াবহতা দমনে সন্তুষ্টিই কিন্তু আমাদের এই সামাজিক সমস্যাগুলি নির্মূল না হওয়ার মূলে রয়েছে।
তবে, সুদূরপ্রসারী সমাধান কি হতে পারে? দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি? আবারও সেই একই উত্তর, "না"। প্রশ্নটা হলো, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে কি আদৌ দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়, নাকি ওটা রাজনৈতিক ক্ষমতাশালীদের ছেলেভোলানো প্রতিশ্রুতি? দোষীর সনাক্তকরণ জরুরি, আইনিব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি, কিন্তু দৃষ্টান্ত কি স্রেফ মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমেই স্থাপন করা যায়? নাকি, সেই দাবিতে আপনাদের তাৎক্ষণিক রক্তপিপাসা চরিতার্থ করতেই কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্ব সায় দিচ্ছেন? অভিযুক্ত কিম্বা দোষীদের তৎক্ষণাৎ মেরে ফেললেই যদি মানুষের বিকৃত, অপরাধপ্রবণতাকে দমন করা যেতো তাহলে কি ২০১২ সালে নির্ভয়ার ঘটনা এবং ২০১৮ সালে ডক্টর প্রিয়াঙ্কা রেড্ডির ঘটনার পর আজকের ঘটনা ঘটতো?
অতএব, সুদূরপ্রসারী সমাধানের পথ বলতে দুটি রয়ে যায়। প্রথম, সামাজিক শিক্ষা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্তর থেকে শুরু করে বয়সের অনুপাতে যৌনতা সংক্রান্ত শিক্ষা (সেক্স এডুকেশন) সরকারী, আধা-সরকারী তথা বেসরকারী উদ্যোগে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া। কষ্টকল্পনা হলেও, ২০১২র নির্ভয়ার ধর্ষণ তথা হত্যাকাণ্ডের সময় থেকে যদি স্কুলে স্কুলে এই পাঠ্যক্রম চালু করা হতো, পরীক্ষা নেওয়া হতো, তাহলে আজকে কয়েক লক্ষ যৌনশিক্ষায় শিক্ষিত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক আমাদের মধ্যে থাকতো। তাতে কি সব সমস্যা সমাধান হয়ে যেতো? হয়তো না। তবে, কিছুটা হতোই।
দ্বিতীয়, জনগণের তৎপরতা। লেখার শুরুতেই যেটা বলছিলাম, রোজ কতকিছুই তো ঘটে, কত অরাজকতার সাক্ষীই তো আমরা প্রতিনিয়ত হতে থাকি। কিন্তু এই রকম প্রতিবাদ দেখিনা কেন? আসলে দেখতে চাইনা। আমাদের মস্ত বড় দোষ। আমরা ভাবি পাঁচ বছরে একবার আঙুলে কালি লাগানোর নাম গণতন্ত্র। কিন্তু একবারও ভেবে দেখিনা, ওই পাঁচ বছরে একবার আমাদের আঙুলে কালিটা না লাগলে এই দুর্বৃত্তদের ক্ষমতায় এসে যথেচ্ছাচার করার সুযোগ হতো না। ওরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, কারণ আমরা সয়ে নিই।
আমরা যদি পাঁচ বছর বাদে কার নামে বোতাম টিপে আঙুলে কালি লাগাবো সেই কথা ভেবে প্রতিদিন তাদের গতিবিধি নজরবন্দি করে রাখতে পারি, তাদের অপরাধপ্রবণত খানিকটা কমবে বলেই মনে হয় ভুলে যাবেন না, সরকার, আইন, সব তৈরি করে মানুষ, এবং সময় এলে তার আদল বদলে দেওয়ার মন্ত্রও মানুষেরই হাতে রয়েছে।
অদ্বিতীয়া মাইতি
ছবি সৌজন্য: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
পড়ার মতো
আর জি কর কান্ডের বিচার চাইতে গিয়ে দেশের অন্যান্য প্রান্তে কি ঘটছে, তা সম্পর্কে অবগত না থাকা উচিৎ নয়। গত মাসের শেষের দিকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু হৃদয়বিদারক সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে গেছে। মোদী সরকার প্রথমবারের জন্য অন্য শরিক দলগুলির উপর নির্ভরশীল। তাও, প্রত্যাশা অনুযায়ী সংখ্যালঘু মানুষের উপর বিদ্বেষের ঘটনা কোনোভাবেই কমেনি। রাম - রহিমকে খুনোখুনিতে লেলিয়ে দিয়ে আম্বানি - আদানি উত্তরোত্তর মুনাফা বৃদ্ধি করবে, তা কখনোই প্রগতিশীল মানুষের মেনে নেওয়া উচিত নয়। লিখেছেন অনন্য চক্রবর্তী, পড়ুন এখানে।
ছবি সৌজন্য: রয়টার্স
দেখার মতো
এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ঘরে ঘরে একটি শব্দবন্ধ নিয়ে বিস্তর আলোচনা: থ্রেট কালচার। রাজ্যের প্রতিটি স্তরে এই ভয় দেখানোর সংস্কৃতি বর্তমান। কারা ভয় দেখান, তা অনুমান করার জন্য কোনো ভারত রত্ন নেই। তাঁরা ভয় কেন দেখান? নিজেদের অবৈধ উপায়ে রোজগারের পথ আরো প্রশস্ত করতে। পাড়ায় পাড়ায় বালি, সিমেন্ট, পাথরকুচি, ইত্যাদির যেমন সিন্ডিকেট, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও সেই সিন্ডিকেট বেশ ক্ষমতাবান। স্বাস্থ্য সিন্ডিকেট কি, কিভাবে তারা কাজ করে, কি কি অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে তারা যুক্ত এবং তাদের সঙ্গে শাসক দল ও সরকার কিভাবে সম্পৃক্ত, বলেছেন প্রখ্যাত চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী। দেখুন উপরে।
আন্দোলনের আটকাহন
সামনেই পুজো। আর জি কর ও দক্ষিণবঙ্গের ভয়াবহ বন্যার আবহে এবারের প্রাক - পুজো মরশুম খানিক ম্রিয়মাণ। তবুও মানুষ সারাবছরের গ্লানি কিছুটা ভুলে এক অপরের পাশে ভালো থাকার বার্তা নিয়ে থাকবেন, এই তো কাম্য। পুজোর আবহে বোনাস পাওয়া প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের অধিকার। অথচ, দার্জিলিং জেলার বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকরা এখনো তাঁদের পর্যাপ্ত বোনাস পাননি। সারাবছর নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, রোদ, ঝড়, জলে চা শ্রমিকরা উচ্চ মানের চা আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেন। শ্রমের বদলে তাঁদের হাতে যৎসামান্য। পর্যাপ্ত বোনাস না পেলে তাঁদের পক্ষে অনেকসময় পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সকলকে অবিলম্বে ২০ শতাংশ বোনাস দেওয়ার দাবিতে আজ ৩০শে সেপ্টেম্বর দার্জিলিঙে সি আই টি ইউ সহ আটটি শ্রমিক সংগঠন ১২ ঘন্টা বনধ এর ডাক দিয়েছিলেন। বনধ প্রায় সর্বাত্মক হয়।
ছবি সৌজন্য: শিলিগুড়ি টাইমস্
স্মরণীয়
সীতারাম ইয়েচুরি (১৯৫২-২০২৪) ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক অগ্রণী সৈনিক। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে কঠিন সময়ে সিপিআইএম দলের হাল ধরা, প্রোলেতারিয় আন্তর্জাতিকতাবাদের ধ্বজাকে উড্ডীন রাখা, ভারতে নানা সাম্প্রদায়িকতা - বিরোধী রাজনৈতিক সমন্বয় সাধনে তাঁর জীবন পরিপূর্ণ এক জয়গাথা। তিনি গত ১২ই সেপ্টেম্বর দিল্লির এইমস হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শগত অবদান নিয়ে লিখেছেন প্রকাশ কারাত। পড়ুন এখানে।
আবার আগামী মাসের শেষে নিয়ে আসবো আরেক দলিল। আমাদের কাজ ভালো লাগলে ছড়িয়ে দিন।





