২৭তম দলিল: নভেম্বর ২০২৪
কল্পনা, বাস্তব, আর রূপকের মাঝে
চারিদিকে অনিশ্চয়তা, চারিদিকে হিংসার পরিবেশ। আমেরিকায় ট্রাম্প বিজয়গর্বে গর্বিত, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা বিপন্ন। ভারতবর্ষে সম্ভলে মসজিদের তলায় মন্দির আছে, সেই বিতর্কের কারণে সাম্প্রদায়িক হিংসার আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে রমরমিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস উপনির্বাচন জিতেছে, মহারাষ্ট্রে বিজেপি জয়লাভ করেছে। নিরাশার সময় সামগ্রিক ভাবে। কিন্তু আমাদের কখনোই হাল ছেড়ে দিলে চলবেনা। বিপ্লবী ধৈর্য্য ধরে কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে যেতেই হবে। তাহলেই সুদিন আসবে।
চিন্তা ভাবনা
"A good editor is, more than anyone else, the person cheering you on to the final glorious finish"
আজ প্রায় ছ বছর হলো আমি সম্পাদনা করছি। শুরু হয়েছিল সেন্ট স্টিফেন্স কলেজের হিস্ট্রি সোসাইটির পত্রিকায় সলতে পাকানোর অনুশীলন। আজ ছাত্র জীবন শেষে আরো জোরদারভাবে সম্পাদক হিসাবে জাঁকিয়ে বসেছি। গত দুবছর ধরে প্রত্যেক মাসে প্রতর্কর আহ্বায়ক - সম্পাদক হওয়ায় বাংলায়, এবং সংকৃত্যায়ন - কোসাম্বি পাঠচক্রের লোকায়ত ব্লগের মুখ্য সম্পাদক হওয়ায় ইংরেজিতে কোনো না কোনো লেখা আমার হাত (বা বলা ভালো, মোবাইল - ল্যাপটপের কিবোর্ড) দিয়ে বেরিয়েছে। মাঝে আমার স্কুলের প্রাক্তনীদের আর জি কর কাণ্ড সংক্রান্ত কাজ নিয়ে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করলাম। সংখ্যা গুনলে ৬০-৭০ টি লেখা হয়েই যাবে। দুটি ভাষার এতগুলি ধরনের, এতগুলি বিষয় সংক্রান্ত লেখা সম্পাদনা করা একরকম কর্মশালাই বটে।
শুরুতেই বলে রাখা ভালো, একজন সম্পাদকের নিজের ব্যাপারে এতো কথা সর্বসমক্ষে বলা ঠিক নয়। মঞ্চসজ্জা শিল্পীর কি স্টেজে উঠে ডায়লগ বলা কাজ? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি নিজে একজন লেখকও বটে। সম্পাদনার সঙ্গে সঙ্গে স্বতন্ত্র লেখার কাজও সমান তালে করার চেষ্টা করে গেছি। স্বতন্ত্র লেখা বলছি, কারণ বেশ কিছু ক্ষেত্রে লেখকের লেখার এক - তৃতীয়াংশ নিজে লিখে দেওয়ার অভিজ্ঞতাও এযাবৎ হয়েছে! সেই সব সময়ে সম্পাদনাও লেখাই বটে! আমার মধ্যে লেখক - সম্পাদকের দ্বৈত সত্ত্বার এই দ্বান্দ্বিক অভিঘাত প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে। অন্যদিন হলে সম্পাদক অনন্য এই লেখায় কোনোদিন সিলমোহর দিতেন না। কিন্তু আজ সম্পাদক নিয়েছেন ছুটি, লেখকের ঘাড়েই আজ মান বাঁচানোর সমস্ত ভার।
অনেকেই এতটা পড়ে ভাববেন, আত্মপ্রচার ছাড়া সম্পাদনা নিয়ে এত ঘটা করে লেখার হেতু কি? আসলে, আমাদের দেশে সম্পাদনা ও তা নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা প্রায় অন্তর্জলী যাত্রায় চলে গেছে, তাই বাধ্য হয়ে এবিষয়ে কলম ধরতে হচ্ছে। সম্পাদনা যে প্রকাশনা প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তা যে নিছক বানান ঠিক করার চেয়ে ঢের বেশি কাজ, এই ধারণাই আজ নেই। আগে প্রতিটি খবরের কাগজ ও নামকরা পত্রিকার ডাকসাইটে সম্পাদকদের নাম পাঠকদের ঠোঁটের ডগায় থাকতো। একজন সম্পাদক যে এক পত্রিকার বিশ্বকর্মা, তা তাঁরা তাঁদের কাজ দিয়ে প্রমাণ করতেন। আজ কতজন পাঠক বহুল প্রচারিত "দেশ" পত্রিকার সম্পাদকের নাম না দেখে বলতে পারবেন, এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নানা পত্র - পত্রিকার সম্পাদকের কেদারায় যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা শুধুই মার্কেটিং করেন, সম্পাদনা নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা বিশেষ নেই। তাই অধিকাংশ লেখাই বিবমিষা এনে দেয়।
এবার তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সম্পাদনা কি? প্রকাশনা ব্যবস্থায় সম্পাদনা হচ্ছে সিনেমা বানানোয় পরিচালনার মতো। সম্পাদককে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সব করতে হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ লেখককে লিখতে বলা, এবং তাঁর থেকে লেখা আদায় করা। লেখকের ধর্মই ধরা না দেওয়া, আর সম্পাদকের কাজ লেখককে সুযোগ বুঝে জাপটে ধরা। লেখা পাওয়ার পর শুরু হয় অন্য সংগ্রাম: লেখাকে পাঠযোগ্য করে তোলা। লেখক স্বভাবতই বাচাল, আর প্রবৃত্তিগতভাবে আত্মগরিমায় টইটম্বুর। তাঁর লেখাকে সমস্ত অহং ও বাহুল্য বর্জিত করে তোলা প্রাচীন রোম তৈরি করার চেয়েও কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে যখন তা কলকাতা শহরের অধিকাংশ আঁতেল জনগণের লেখার মতো অন্তঃসারশূন্য হয়। সেই লেখা পড়ে যাতে পাঠকের বিষম না লাগে, বা হঠাৎ মাইগ্রেন না হয়, তার প্রতি যত্নশীল হওয়ার দায়িত্ব সম্পাদকের। সামগ্রিক সম্পাদনা ও বাক্য ধরে ধরে সংশোধন করার পরে টাইপসেটিং বা অনলাইন ফন্ট ঠিক করা চলে আসে। আজকাল ভুয়ো খবরের যুগে তথ্য যাচাই করে নেওয়াও বা করিয়ে নেওয়াও সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। লেখা ছাপার অক্ষরে বেরোনো না অবধি সম্পাদকের কোনো শান্তি নেই।
সম্পাদক অনন্য বড্ড রেগে আছেন মনে হচ্ছে! বুঝি, আসলে অনেকরকম ঝক্কি পোয়াতে হয় তো! আগের কথাগুলি পড়ে যদি কারুর মনে হয় সম্পাদক - লেখকের সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়, তাহলে তাঁরা আংশিক ভাবে সঠিক। সম্পাদক যেমন লেখককে সন্দেহ করেন, লেখকও কম সন্দেহ করেন না। বাংলা বাজারে সন্দেহ করাটাই খুব স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্পাদক মহাশয় একটি লেখা আমূল বদলে দিয়ে তার মাথা মুন্ডু কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা। লেখকের উচ্ছিষ্ট হিসাবে যা পড়ে থাকে, তা যৎসামান্য। অথচ এটা কখনোই হওয়ার কথা নয়। সম্পাদনার প্রথম শর্ত পরিমিতিবোধ। হাতে ছুরি ধরিয়ে দিলেই যেমন খুন করতে নেই, তেমনই কলম থাকলেই কাটতে নেই। কতটা কাটা, কতটা রাখা, এই বোধকেই সম্পাদনা বলে। সম্পাদক কোনো অবস্থাতেই লেখকের স্বতন্ত্র ভাষ্যের উপর নিজের কতৃত্ব ফলাতে পারেন না। আমি খুব সহজ একটি নিয়ম মানি। যদি কারুর লেখা পড়ে মনে হয় তার ৩০% পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে, আমি তাতে বিস্তারিত মতামত দিয়ে লেখককে ফেরত পাঠাই। কারণ ওই লেখা আমি নিজে সংশোধন করে দিলে তা অনেকটাই আমার লেখা হয়ে যাবে।
তা বলে কি শুধুই বৈরিতা? একেবারেই নয়। সম্পাদক লেখকের সবচেয়ে নির্মম সমালোচক, কারণ সম্পাদক ভালো লেখার পক্ষে। তিনি লেখার গুণগত মান বৃদ্ধির পক্ষে। তার একটাই হেতু, পাঠকের মঙ্গলকামনা। সম্পাদকের কাছে পাঠক ভগবান। পাঠককে এক আরামদায়ক পড়ার অভিজ্ঞতা দেওয়াই সম্পাদকের কাজ। সেই জন্যই সম্পাদক লেখকের সবচেয়ে বড় সমর্থকও। ভালো লেখা ছাপলেও তা লেখকের নামেই ছাপবে। খারাপ লেখাও। তাই, লেখকরা আমাদের মতো নেপথ্যে থাকা সম্পাদকদের প্রতি একটু সহায় হতেই পারেন!
সম্পাদক অনন্য ফিরে এসেছেন, এবার লেখক অনন্যর ছুটি। সম্পাদনায় ত্রুটি থাকলে তা সম্পূর্ণ লেখকের দোষ!
অনন্য চক্রবর্তী
পড়ার মতো
২০২৪ সালে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের জন্মমাসে তাঁর লেখার পঠন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আজকের সময় প্রতিনিয়ত অনেক নিরাশার জন্ম দেয়। নিরন্তর দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অশিক্ষা, বেকারত্ব, বিশ্বের খেটে খাওয়া মানুষকে অন্ধকূপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জলবায়ুর ভারসাম্য বিনাশ হওয়ায় পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। এ সময় বিপ্লবী সময় নয়। কিন্তু ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা যাঁরা করতে সক্ষম, তাঁরা জানেন ইতিহাস সদা পরিবর্তনশীল। ইতিহাসের নানা ধারার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের কারণে পুঁজিবাদী সমাজ একদিন বিনষ্ট হবেই। এ কোনো অমোঘ পরিণতির প্রতি জ্যোতিষীর লোলুপ দৃষ্টি নয়, ইতিহাসের চলমান ধারার অনুশীলনের গাম্ভীর্য। পরিবর্তনশীল ইতিহাসের প্রতিলিপি এঙ্গেলসের অসমাপ্ত ক্ল্যাসিক "রোল অফ ফোর্স ইন হিস্ট্রি" তে ব্যক্ত হয়েছে। সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন সৌভিক ঘোষ। পড়ুন এখানে।
শোনার মতো
'মার্কসবাদী পথ' অনুষ্ঠিত প্রথম কাজী নজরুল ইসলাম স্মারক বক্তৃতা দিলেন অধ্যাপক আব্দুল কাফি। এক উত্তাল অস্থির সময়ে তাঁর বক্তব্য বারবার শোনার মতো।
"একটি টেক্সট ইতিহাসের বিশেষ কোনও সংকটের সামনে কীভাবে দাঁড়ায়, কীভাবে সে-সংকটের কোনও উত্তর বা সমাধান কিংবা কোনও তকরার হাজির করে— এই খতিয়ে দেখাকে ‘হিস্টোরিসাইজড’ অর্থে চিহ্নিত করতে চাইছেন ফ্রেডরিখ জেমিসন। ফলে রক্তকরবী-কে হিস্টোরিসাইজড করতে গেলে অনিবার্যভাবেই আমাদের সময়ের দিকে তাকাতে হবে। সে-প্রসঙ্গে উঠে আসবে নজরুলের ধূমকেতু, লাঙল, আবুল হুসেনের প্রবন্ধ সহ আরও অন্যান্য বিষয়ের কথা। পুঁজিবাদ একমাত্রিক কাঠামো তৈরি করার জন্যে সংস্কৃতিকে বানিয়ে তোলে নিজের স্বার্থে, ব্যবহার করে ধর্মকে। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী-র আগে রাষ্ট্র-ধর্ম-সংস্কৃতির যোগসাজশের কথা এতো প্রাঞ্জলভাবে খোলাখুলি অন্য কোনও সাহিত্য-কর্মে সম্ভবত নেই।"
আন্দোলনের আটকাহন
নভেম্বর মাসে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির ন্যূনতম হারের প্রয়োজনীয়তা তুলে দেওয়ার দাবিতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলন সংগঠিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু ছাত্রের উপর গুরুতর অপরাধ ঘটানোর অভিযোগ করেছেন। ছাত্ররা অলস ও অমনোযোগী, তাই তারা ক্লাসে না আসার অজুহাত খুঁজছে, এই মর্মে বক্তব্য ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ, নয়া শিক্ষানীতির জন্য ছাত্র ছাত্রীরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ক্লাসের উপস্থিতির হার কমে যাচ্ছে, কারণ নানা অপ্রয়োজনীয় জিনিস তাদের পড়তে হচ্ছে। এই আন্দোলন গভীরে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন সেখানকার ছাত্র, ইয়ানিস ইকবাল। পড়ুন এখানে।
স্মরণীয়
অমিয় কুমার বাগচী (১৯৩৬-২০২৪) বরেণ্য মার্কসবাদী অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে অর্থ নিষ্কাশনের স্বরূপ চেনানোয় তাঁর অবদান অপরিসীম। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বে পুঁজির হিংস্রতা বিষয়ক তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ। পড়িয়েছেন কেমব্রিজে, প্রেসিডেন্সিতে। ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস কলকাতার তিনি প্রতিষ্ঠাতা। ২৮শে নভেম্বর ২০২৪ কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর লেখা পড়ুন এখানে।





